রাজপথের রোগ

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯

অভিধানে যদিও 'রাজপথ' অর্থ পথের রাজা; রাজধানী ঢাকার অনেক সড়কের পরিস্থিতি দেখা আভিধানিক ওই অর্থ উপহাসই মনে হবে। পরিস্থিতি পরিহাসযোগ্য কেবল এই কারণে নয় যে, চার শতাব্দী প্রাচীন এই নগরীর অধিকাংশ অপ্রধান সড়ক এখনও খানাখন্দে ভরা থাকে। বরং পরিহাস এই যে, সড়কগুলো অনেক সময় চলাচল অযোগ্য হয়ে ওঠে 'উন্নয়ন' কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে। আমরা দেখি, একটি সংস্থা কোনো সড়ক সংস্কার করার কিছুদিনের মাথায় আরেকটি সংস্থা এসে তা খুঁড়ে রেখে চলে যায়। আজ যদি গ্যাস লাইনের জন্য, তো কাল পানির লাইনের জন্য। সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির বাতিক রয়েছে বিদ্যুৎ ও টেলিফোন বিভাগেরও। ফলশ্রুতিতে সদ্য সংস্কারকৃত সড়কের নতুন করে সংস্কারের প্রশ্ন সামনে আসে। এসব ক্ষেত্রে সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের তাগিদ দিতে দিতে আমরা ক্লান্ত হয়ে গেছি। কিন্তু পরিস্থিতি যে তথৈবচ, বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন তার সর্বসাম্প্রতিক উদাহরণ। তাতে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীর খিলগাঁও ও শাহজাহানপুর এলাকায় 'সুস্থ' রাস্তা পাওয়াই মুশকিল। খোঁড়া-আধখোঁড়া রাস্তায় যত্রতত্র পড়ে থাকা পাইপ, মাথা তুলে থাকা 'নতুন' ম্যানহোলের কাঠামো- প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত আলোকচিত্রের এই দৃশ্য বৃষ্টি-বাদলে আরও 'অসুস্থ' হয়ে ওঠে বলা বাহুল্য। এও কম পরিহাসের বিষয় নয় যে, সিটি করপোরেশন নাগরিকদের এই 'সাময়িক' অসুবিধা তৈরি করছে জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে। এই প্রশ্ন এখন কে করবে যে, নাগরিক ভোগান্তি না করেই কি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যেত না? বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সড়ক সংস্কার হয়। কিন্তু সেখানেও কি চিকিৎসার নামে খোদ সড়কই অসুস্থ হয়ে পড়ে? অস্বীকার করা যাবে না, তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের নাগরিকরা এক-দুই সপ্তাহ এমন অসুবিধা মেনে নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু মাসের পর মাস যখন ক্ষত-বিক্ষত সড়ক মুখব্যাদান করে থাকে, তখন সংশ্নিষ্টদের ঔদাসীন্যই স্পষ্ট হয়। আমরা দেখছি, ওই এলাকার ১২টি ওয়ার্ডে এখন এই 'কর্মযজ্ঞ' চলছে। খোঁজখবর করলে সিটি করপোরেশনের আরও কিছু ওয়ার্ডে কমবেশি একই পরিস্থিতি চোখে পড়বে। বস্তুত আমাদের রাজপথের এ যেন এক নিরাময় অযোগ্য 'রোগ'। আমরা জানি, দেশের সড়ক সংস্কার কাজ কী ধরনের দুষ্টচক্রের কবলে পড়েছে। নিম্নমানের কাজের কারণে সংস্কারের পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সড়কের খাল-বাকল উঠে যাওয়ার চিত্র হামেশাই সংবাদমাধ্যমের উপজীব্য হয়। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে দিনের পর দিন সড়ক খুঁড়ে ফেলে রাখা সম্ভবত এই দুষ্টচক্রে সাম্প্রতিক সংযোজন। এই অভিযোগ অমূলক হতে পারে না যে, ইচ্ছাকৃত এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করার নেপথ্যে কেবল ঠিকাদারের ঔদাসীন্য নয়, কর্তৃপক্ষের উৎসাহও কাজ করে। একবারেই যদি মানসম্পন্ন কাজ করা হয়, তাহলে একদিকে যেমন ভাগবাটোয়ারার অঙ্ক ছোট হওয়ার 'আশঙ্কা' থাকে, অন্যদিকে প্রতি বছর সংস্কার কাজের নামে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণের 'সুযোগ' কমে যায় বৈকি! দিন যায়, বছর যায়, ঋতু বদলায়, সরকার পরিবর্তন হয়; কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন অবয়বে সড়ক সংস্কারের এই মৌরসি পাট্টা যেন রয়েই যায়। রাজধানী বা দেশের সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে এভাবে বিপুল অর্থ যদি ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর পকেট ভারী করতে থাকে, তাহলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। মনে রাখতে হবে, সড়ক সংস্কার খাতে বরাদ্দ অর্থের বিপুল অধিকাংশ আসে হয় নাগরিকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ থেকে অথবা মাথাপিছু বাড়তে থাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে। ফলে রাজপথের রোগ কেবল রাজপথের নয়, সাময়িক অসুবিধা ছাড়াও নাগরিকের দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথার কারণ।