রোহিঙ্গা সংকট

এ বোঝা আমরা কতদিন বইব!

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে রোহিঙ্গা শরণার্থীর আগমন নতুন নয়। সত্তরের দশক থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা সংখ্যায় তারা আসছে। সর্বশেষ ভয়াবহ গণহত্যা ও বিভিন্ন মাত্রায় নিপীড়ন-নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে। এরই দু'বছর পূর্ণ হলো আজ। দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক তৎপরতার পর ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন সত্ত্বেও তা ব্যর্থ হলো। আশ্রিতদের অনুপাতে সংখ্যায় নিতান্ত নগণ্য হলেও সব রকমের আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে যারা ফেরত যেতে রাজি হয়নি, এর পেছনে মিয়ানমারের সদিচ্ছা তো বটেই, নানারকম অস্পষ্টতার অভিযোগও পুষ্ট। ধারণা করা যায়, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কর্মরত দেশি-বিদেশি কিছু উন্নয়ন সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমও অবদান রাখতে পারে। শনিবার সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এর যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে বহুবিধ প্রশ্নই দাঁড়ায়।

আশ্রিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের আর্থসামাজিকসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি করছে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তো বটেই, বহির্বিশ্বে আমাদের শ্রমবাজারেও এর বিরূপ প্রভাব ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। বাংলাদেশ মানবিক কারণে যে উদারতা প্রদর্শন করেছিল, এর অপব্যবহার ও কূটকৌশল অবলম্বন করছে মিয়ানমার এবং একই সঙ্গে আশ্রিত রোহিঙ্গারাও। গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রথম দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায়ও এই প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আবারও অনিশ্চয়তার বৃত্তবন্দি হলো কি-না এমন প্রশ্নও উঠেছে। আমরা জানি, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। একটি ওয়ার্কিং কমিটিও গঠিত হয়েছিল দু'দেশের ১৫ জন করে সদস্যের সমন্বয়ে। তখন প্রত্যাবাসনের নির্ধারিত তারিখ পিছিয়ে যায় মিয়ানমারের নানারকম কূটকৌশলের কারণে। অবশেষে যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাছাই করা তিন হাজার ৪৫০ রোহিঙ্গা সদস্যের একটি তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে দেয় মিয়ানমার। এর সূত্র ধরেই বিগত কয়েকদিন এদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নাগরিকত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও এর দায় তো বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য নিতে পারে না। যে বর্বর-পৈশাচিক-ন্যক্কারজনক কাণ্ড রাখাইনে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত হয়েছে, নতুন করে এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন। মিয়ানমার বিশ্ব সম্প্রদায়কে বোকা বানিয়ে নানারকম কূটকৌশল এখনও অব্যাহত রেখেছে। এ অঞ্চলে বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ সরকারের মানবতাবাদী আচরণের প্রশংসা ছাড়া কার্যত মিয়ানমারের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। রাখাইনে সামরিক অভিযানের পক্ষে দু'বছর আগে মিয়ানমার যে সুরে কথা বলেছে, তাদের বর্তমান অবস্থানও এ থেকে ভিন্ন কিছু নয়। কয়েকটি রাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও তা এতটাই সীমিত আকার কিংবা পরিসরে যে, এ কারণে এরও সুফল মিলছে না। এমনকি নোবেলজয়ী 'এককালের মানবতাবাদী' নেতা অং সান সু চির কাছেও কোনো নিন্দা-সমালোচনাই আমলযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি, হচ্ছে না।

বাংলাদেশের যে অঞ্চলে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো অবস্থিত, প্রাকৃতিক দিক থেকে আমাদের এই এলাকা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কিন্তু এখন তা চরম হুমকির মুখে। স্থানীয় নাগরিকদের জীবনে নেমে এসেছে নানারকম দুর্যোগ। আশ্রিতদের দুস্কর্মের নানা চিত্র প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। নিরাপত্তাজনিত হুমকি বাড়ছে। তারা সন্ত্রাস, খুনখারাবি, মাদক ব্যবসাসহ এমন সব দুস্কর্মে লিপ্ত হচ্ছে, যা সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের ওপর এই নানামুখী চাপের ব্যাপারে বিশ্ব সম্প্রদায়কে ভাবতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। আগে যারা এসেছিল তাদের অনেকেই ফেরত যায়নি, আমাদের সমাজে নানাভাবে মিশে গেছে। এবার যেন তা না ঘটে।

জাতিসংঘ বলেছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে যাবতীয় শর্ত পূরণের দায় মিয়ানমারের। যদি তাই হয়, তাহলে তাদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রবল করা হচ্ছে না কেন? প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার দিনের পর দিন বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। রোহিঙ্গাদের ফেরত যেতেই হবে। রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়ে দেশছাড়া করার দায় মিয়ানমারের। কাজেই রোহিঙ্গাদের আস্থা অর্জন করে ফিরিয়ে নেওয়ার দায়ও তাদেরই।