অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ

এক বিরল রাজনীতিকের বিদায়

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯      

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) সভাপতি এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের প্রয়াণে সমকাল পরিবার গভীর শোকাহত। বস্তুত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের শোক প্রকাশের মধ্য দিয়ে গোটা জাতির বেদনাই প্রতিফলিত হয়েছে। শুক্রবার রাতে ৯৭ বছর বয়সে তার মৃত্যুকে যদিও কোনো বিবেচনাতেই অকাল বলার অবকাশ নেই, দেশ ও জাতির প্রয়োজনেই আরও কিছুদিন তার উপস্থিতি প্রত্যাশিত ছিল। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, তিনি অন্তত শতায়ু হবেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন উপদেষ্টা পরিষদের একমাত্র জীবিত এই সদস্যের মৃত্যুতে আমাদের রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হলো তা সহজে পূরণ হবে না। প্রবাসী সরকারের প্রতি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন আদায়ে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ওই সমর্থন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণে ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধিকার অর্জনের আন্দোলন পেরিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যারা অবদান রেখেছেন- অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সেই প্রজন্মের রাজনীতিকদের শেষ প্রতিনিধি। আমরা প্রত্যাশা করি, রোববার কুমিল্লার দেবীদ্বারের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত হওয়ার মধ্য দিয়েই তিনি দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবেন না। তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনীতিকদের পথ দেখিয়ে চলবে। বিশেষত মোজাফফর আহমদের নির্লোভ চরিত্র ও স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানোর ঋজুতা আজকের রাজনীতিতে বিরল। প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা হলেও তিনি স্বাধীনতা-উত্তর মন্ত্রিসভায় যোগদানে অসম্মতি জানিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদক গ্রহণেও তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এই দুই অবস্থানের পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক হতে পারে; কিন্তু এভাবে অবস্থান নিতে কতজন পারে? তিনি যেভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে সক্রিয় রাজনীতির সুকঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেটাও নজির হয়ে থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি, মোজাফফর আহমদের উদার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সরস বক্তব্য জনসাধারণের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে। আমরা জানি, তার রাজনৈতিক দলটি বয়সে প্রাচীন হলেও সাংগঠনিকভাবে স্বাধীনতার পর ক্রমে সংকুচিত হতে থাকে। কিন্তু মোজাফফর আহমদের ব্যক্তিত্ব দলটিকে সক্রিয় রেখেছিল। আমরা দেখতে চাইব, অনুপস্থিতিতেও দলটি তার আদর্শের মশাল নিয়ে এগিয়ে যাবে এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অবদান রাখবে। আমরা দলমত নির্বিশেষে সব রাজনীতিকের প্রতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানাতে চাই। এই বিরল রাজনীতিকের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে তার মতো ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা আরও একবার অনুভূত হলো। আমরা তার শোকসন্তপ্ত পরিবার ও স্বজনদের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।