নালিশ করে বালিশ পায়

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা বুধবার কূটনীতিকদের সঙ্গে 'রুদ্ধদ্বার' বৈঠকে দেশের সর্বশেষ 'রাজনৈতিক পরিস্থিতি' তুলে ধরেছেন। বস্তুত এর আগেও এই জোটের নেতারা একাধিকবার কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। আমরা জানি, কূটনীতিকদের সঙ্গে রাজনীতিকদের এ ধরনের বৈঠক বাংলাদেশে নতুন নয়। বিশ্বে আর কোনো দেশে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিদেশি কূটনীতিকদের এভাবে 'অবহিত' করার রেওয়াজ রয়েছে কি-না, তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। বিষয়টি যে কেবল একপক্ষীয়, এমন নয়। ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা যেভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে 'আগ্রহী', তারও নজির আর কোনো দেশে আছে? আমাদের মনে আছে, স্বাধীনতার পর সত্তর দশকের টালমাটাল সময়ে বিদেশি কূটনীতিকরা কীভাবে নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন, পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত নানা দলিল, নথি ও বইপত্রে তার ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে। পঁচাত্তরের মর্মন্তুদ পট পরিবর্তনের পর কিছু বিদেশি কূটনীতিকের ভূমিকা হয়ে পড়েছিল আরও প্রকাশ্য। এমনকি রাষ্ট্রক্ষমতায় কারা থাকবে না থাকবে, সে ক্ষেত্রেও প্রভাবশালী দেশগুলোর 'আশীর্বাদ' প্রয়োজন হতো।

আশার কথা, শেখ হাসিনার টানা তিন মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বে এ ধরনের দৌত্য বা দৌরাত্ম্য বহুলাংশে কমে গেছে। আমরা দেখছি, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ওই নির্বাচন পিছিয়ে দিতে বা তাদের ভাষায় 'অংশগ্রহণমূলক' করতে পশ্চিমা কূটনীতিকদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। তার আগের কয়েক মেয়াদে প্রচলিত অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানও শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। দেশের সংবিধান মেনে নির্বাচিত সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। হতে পারে সেই অভিজ্ঞতা আমলে নিয়েই কূটনীতিকরা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আর আগের মতো প্রকাশ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তাদের কাছে নালিশ করতে যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোকে বরং দেশের সংবিধান অনুসরণ করে বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারায় অংশগ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কেবল 'কূটনৈতিক' ক্যারিশমা নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো অতীতে বহুবার অর্থনৈতিক চাপও প্রয়োগ করে এসেছে। সে ক্ষেত্রে বিরাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা অনুদানমূলক সংস্থাও পরোক্ষভাবে কাজ করেছে প্রভাবশালী দেশগুলোর পক্ষে। আমাদের মনে আছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে ঠুনকো অভিযোগ তুলে কীভাবে অর্থায়ন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ যেভাবে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল, তা দশক প্রাচীন 'আর্থ-কূটনৈতিক' খেলোয়াড়দের বড় ধাক্কা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রমত্ত নদীর বুকে দেশের বৃহত্তম এই সেতুর অবকাঠামো মাথা তুলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জয়গান গাইছে। আমরা মনে করি, এই সেতু একই সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক পরিপকস্ফতারও নজির।

দেশের রাজনীতি এমনকি অর্থনীতিতে যখন বিদেশি কূটনীতিকদের প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা অস্তাচলের পথে, তখন কূটনীতিকদের 'নালিশ' জানিয়ে কী পেতে পারে ঐক্যফ্রন্ট? লক্ষণীয়, এই বৈঠকে পশ্চিমা কয়েকটি দেশের কূটনীতিক ছাড়া আঞ্চলিক প্রভাবশালী পক্ষগুলো অংশগ্রহণ পর্যন্ত করেনি। সমকালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কূটনীতিকরা বরং জোটকে আরও শক্তিশালী ও সক্রিয় করার 'ইঙ্গিত' দিয়েছেন। আমরাও মনে করি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অবস্থান শক্তিশালী না হলে কেবল বহির্দেশীয় আশীর্বাদে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তোলা কঠিন। এটাও এখন স্পষ্ট, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারা ও নির্বাচনী প্রবাহ এখন আর বিদেশি কোনো পক্ষের পরামর্শে চলবে না। বাংলাদেশ যেমন নিজের শক্তিতে এখন বলীয়ান, আমরা দেখতে চাইব রাজনৈতিক দলগুলোও নিজস্ব সামর্থ্যের ওপর ভরসা রাখছে।

বাংলায় প্রবাদ রয়েছে 'নালিশ করে বালিশ পায়'। বিদ্যমান বাস্তবতায় কূটনীতিকদের কাছে নালিশ করে বালিশই পাওয়া যেতে পারে। সেই আশ্বাসের বালিশে হেলান দিয়ে আরামও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাতে রাজনীতিতে কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না।