বুয়েটে বর্বরতা

ছাত্রলীগে আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৯      

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলে সোমবার রাতের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের এরই মধ্যে বহিস্কার করেছে সংগঠনটি। বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও এ ব্যাপারে কড়া অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি যথার্থই বলেছেন যে, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচ্য নয়। আমরা মনে করি, তারপরও এই অঘটনের দায় ছাত্রলীগ এড়াতে পারে না। ওই হলে আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও নানা অজুহাতে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন, নিপীড়ন করেছে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এমনকি সেখানে 'টর্চার সেল' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল একটি কক্ষকে! আমরা বিশ্বাস করি না যে, এই চিত্র ছাত্রলীগ শীর্ষ নেতৃত্বের অজানা ছিল। কেবল বুয়েটে নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এভাবে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতন, চাঁদাবাজি, মাদক সেবনসহ নানা অপকর্মের খবর প্রায়শই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়।

অস্বীকার করা যাবে না যে, ঘটনা প্রকাশ পেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বহিস্কারের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়। আমাদের প্রশ্ন, অঘটন প্রকাশের আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন? বুয়েট ছাত্রলীগে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অপকর্মের ব্যাপারে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সক্রিয় হলে আবরার হত্যাকাণ্ড এড়ানো যেত। এই অঘটনের পর ছাত্রলীগ নেতৃত্বকে এখন আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে হবে। এর আগেও বিভিন্ন ক্যাম্পাসে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এই সম্পাদকীয় কলামেই বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হয়েছি যে, সাড়ে ছয় দশকের ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটি কি পথ হারিয়েছে? সামাজিক ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক মুক্তির জন্য 'শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি' আদর্শ হিসেবে সামনে রেখে গঠিত ছাত্র সংগঠনটিতে কেন অশিক্ষা, অশান্তি, অন্যায় ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বাড়বাড়ন্ত? নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখতে বলেছি, একসময় মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সংগঠনটি কেন এভাবে সন্ত্রাসী ও বখাটেদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে? আমরা স্বীকার করি, সার্বিক ছাত্র রাজনীতিরই নিদারুণ অবনতি ঘটেছে সাম্প্রতিককালে।

বর্তমান ছাত্র রাজনীতিতে আদর্শের অনুপস্থিতি প্রকট। আসলে ছাত্র রাজনীতি যখন অবৈধ উপার্জন ও ক্ষমতার মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধই অনিবার্য হয়ে ওঠে। আমরা মনে করি, নিজের সংগঠন ছাড়াও সার্বিক ছাত্র রাজনীতির বিশুদ্ধতা ফিরিয়ে আনতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের দায় ও দায়িত্ব অন্যদের তুলনায় বেশি। আমরা দেখতে চাইব, বিলম্বে হলেও ছাত্রলীগ বুয়েট ছাড়াও অন্যান্য শাখায় 'শুদ্ধি অভিযান' শুরু করুক। সন্ত্রাসী, মাদকাসক্তদের চিহ্নিত করে সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হলে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসবে। একই সঙ্গে সৎ, যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের স্থান করে দিতে হবে প্রথম সারিতে। যাতে করে তারা ছাত্রলীগের ঐতিহ্য, গৌরব ও ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখতে পারেন। আমরা জানি, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রলীগ। এখনও চাইলে গৌরবময় সেই ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে না।