ভুভুজেলার দেশে ভীতির চিত্র

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে গত পাঁচ বছরে সাড়ে চারশ'র বেশি বাংলাদেশি নাগরিকের লাশ দেশে এসেছে- বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত এই খবর যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জীবিকার প্রয়োজনে গিয়ে জীবন হারানোর অঘটন নতুন নয়। বিশেষত মধ্য ও দূরপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে নির্মাণশিল্পে বাংলাদেশি শ্রমিকরা বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয়। সাগর কিংবা পাহাড় পেরিয়ে ইউরোপে বিপজ্জনক যাত্রায় প্রাণ হারানোও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। কিন্তু শুধু একটি দেশ থেকে এত বাংলাদেশির লাশ আসছে কেন?

আলোচ্য প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশি নাগরিকদের নিহত হওয়ার কারণ মূলত ব্যবসায়িক বিরোধ, নারী-পুরুষ সম্পর্কের বিরোধ কিংবা সেখানে বাংলাদেশবিরোধী সহিংসতা। দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এএফপিকে বলেছেন, নিহত বাংলাদেশির প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেকের পরিবারই হয়তো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লাশ দেশে পাঠায়। সেখানেই কবর দেওয়া হয় কারও কারও। কোনো কোনো নিহত ব্যক্তির খবর হয়তো অগোচরেই রয়ে যায়। কারণ অনেকেই সেখানে গেছেন অবৈধভাবে।

আমরা জানি, গোটা আফ্রিকা মহাদেশে বাংলাদেশি নাগরিকের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। আশির দশকের শেষভাগ থেকে মূলত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর অংশ হিসেবে বাংলাদেশি সেনা মোতায়েন শুরু হয়। পরে যেতে শুরু করে শ্রমিক। ওই মহাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশির বাস। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় সেখানে বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা এক লাখ থেকে তিন লাখ পেরিয়ে গেছে। এখন সেখানে বাংলাদেশিরা কেবল শ্রমিক নন, বরং খামারি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। আমরা আনন্দের সঙ্গে দেখছিলাম, ভূমির মালিকও হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। এর ফলে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশি জনশক্তি নিছক শ্রমিক নয়, বরং অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, বেকারত্ব দেশটির নাগরিকরা বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তি ভালোভাবে গ্রহণ করছে না। সেখানে মাদক গ্রহণের হারও ব্যাপক। অর্থনৈতিক কারণে বিক্ষুব্ধ কিংবা মাদকের প্রভাবে বিভ্রান্ত দক্ষিণ আফ্রিকান নাগরিকদের কেউ কেউ তাই বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর হামলা করছে। বাড়ছে মৃত্যুর ঘটনা।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে কী করণীয়? আমরা বিভিন্নভাবে জেনেছি, বাংলাদেশি নাগরিকদের কেউ কেউ সেখানে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতে নারীঘটিত বিরোধেও জড়িয়ে পড়েন। এতে করে সামাজিক অসন্তোষ বা বিরোধ তৈরি হয়। আমরা মনে করি, সুদূর বিদেশে এ ধরনের বিরোধ থেকে দূরে থাকার বিকল্প নেই। এইচআইভি এইডসে ওই দেশের উচ্চহারের কথাও ভুলে যাওয়া চলবে না। দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস প্রবাসী নেতৃবৃন্দকে নিয়ে এ ব্যাপারে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। বাংলাদেশিদের ব্যাপারে সামাজিক অসন্তোষ যাতে কমে, সেজন্যও নেওয়া যেতে পারে কর্মসূচি।

দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকদের সঙ্গে ব্যবসায়িক বিরোধ বা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্কতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। দূতাবাসের উচিত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রশাসনের সঙ্গেও বাংলাদেশের নাগরিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা। কীভাবে প্রবাসীদের নিরাপত্তা বাড়ানো যায়, এ ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়েও আলোচনা হওয়া উচিত। বস্তুত দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার যদি হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে, তাহলেই এ ধরনের অপরাধের হার কমে আসবে।

দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে বাংলাদেশে আগ্রহ ও আন্তরিকতা কম নেই। তাদের ক্রিকেটের ভক্ত কিংবা ভুভুজেলায় মুগ্ধ বাংলাদেশির সংখ্যা কম নয়। সেখানে বাংলা ভাষার প্রসার নিয়েও আমরা সন্তোষ ব্যক্ত করে থাকি। কিন্তু বাংলাদেশিদের লাশে পরিণত হওয়ার নেতিবাচকতার সঙ্গে এসব ইতিবাচক দিক তুল্যই হতে পারে না। আমরা নিশ্চয়ই চাই দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বাড়তে থাকুক; কিন্তু তা কোনোক্রমেই জীবনের বিনিময়ে নয়।