বাজেট ঘাটতি

রাজস্ব ও ঋণছাড় বাড়াতেই হবে

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সরকারের আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য বা বাজেট ঘাটতি অস্বাভাবিক নয়। বস্তুত পুরো অর্থবছরে জিডিপির ৫ শতাংশ বাজেট ঘাটতি অর্থনীতিতে স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে। গত অর্থবছরসহ সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশেও আমরা একই চিত্র দেখে এসেছি। কিন্তু রোববার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনটিতে বাজেট ঘাটতির যে চিত্র প্রকাশ হয়েছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। আমাদের উদ্বেগের কারণ দ্বিবিধ। একদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাজেটের ঘাটতি যা দাঁড়িয়েছে, তা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে প্রথম প্রান্তিকেই রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। গত বছর একই সময়ে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি যেখানে প্রায় ছয় শতাংশ ছিল, এবার তা তিন শতাংশেরও কম। মনে রাখা জরুরি, অর্থবছরের শেষার্ধে যেমন ব্যয় বাড়তে থাকে তেমনই শ্নথ হয়ে আসে রাজস্ব আদায়ের হার। সকালের টিমটিমে সূর্য কি তাহলে বিকেলের জন্য কোনো নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে? এ পরিস্থিতিতে অর্থবছর শেষে বাজেট ঘাটতির হার জিডিপির ছয় শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তা আমাদের কাছেও অমূলক মনে হয় না। আমরা প্রত্যাশা করব, নীতিনির্ধারকরা এই উদ্বেগ আমলে নেবেন। অস্বীকার করা যাবে না, সরকার পদ্মা সেতুসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছে। বাড়ানো হয়েছে নাগরিক সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তা জালের আওতাও। ফলে বড় অঙ্কের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি মাত্রায় 'ধার' নিতে হচ্ছে সরকারকে। স্বাভাবিকভাবেই বেশি সুদহার পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই নীতি বেসরকারি খাতের ওপরও চাপ বৃদ্ধি করবে এবং মূল্যস্ম্ফীতি ও বিনিময় হারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পরিস্থিতির উত্তরণে এখন বৈদেশিক ঋণছাড়ের হার দ্রুত বাড়াতে হবে, অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য যথার্থই বলেছেন। এ ব্যাপারে আমাদের নীতিনির্ধারকদের বাড়তি সক্রিয়তা প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানোরও বিকল্প নেই। আমরা জানি, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায়ের আওতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমাদের জিডিপির তুলনায় এই হার এখনও কম। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক চিত্রের তুলনায় আমাদের জিডিপি-রাজস্ব অনুপাত উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম। এক্ষেত্রে করের আওতা বাড়ানো 'সহজ' সমাধান। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ও আয়-বৈষম্যের কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা দেখতে চাইব, বিদ্যমান আওতার মধ্যে থেকেই কর আদায়ে সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। দক্ষতা বাড়িয়ে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানোর সুপারিশও আমরা এ প্রসঙ্গে করতে চাই। আমরা মনে করি, সংশ্নিষ্ট পক্ষগুলো পরিস্থিতি গুরুত্বের সঙ্গে না নিলে বাজেট ঘাটতির বিদ্যমান প্রবণতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে। আমরা যখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন বাজেট ঘাটতি স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে রাখার বিকল্পও নেই।