শেয়ারবাজার

এভাবে চলতে পারে না

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২০

ইংরেজ সাহিত্যিক উইলিয়াম শেকসপিয়রের কালজয়ী 'হ্যামলেট' নাটকের বিখ্যাত সংলাপ 'সামথিং ইজ রটেন ইন দ্য স্টেট অব ডেনমার্ক' বিশ্বজুড়েই প্রবাদে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করতেও আমরা ওই সংলাপের আশ্রয় নিতে পারি- এখানে গুরুতর কিছু একটা ঘটেছে। অন্যথায় গত কয়েক বছর শেয়ারবাজারের সূচক ক্রমাগত অবনতি হতে থাকবে কেন? মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বিনিয়োগকারীদের টাকা 'হাওয়া' হয়ে যাওয়ার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতে অত্যুক্তি নেই। আমরা দেখছি, সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে এক দিনের দরপতন প্রায় পাঁচ বছরের 'রেকর্ড' ভেঙেছে। নিছক এক দিনের আকস্মিকতা নয়; দেশের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জে গত পাঁচ বছরে বাজার মূলধন কমেছে এক লাখ কোটি টাকা। মনে রাখতে হবে, শেয়ারবাজারে নানা সময়ে একেকটি মন্দার ঢেউ মানে হাজার হাজার পরিবারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়া। সোমবার রাজধানীর বনানীতে বহুতল ভবন থেকে লাফ দিয়ে এক বীমা কর্মকর্তার আত্মহত্যার সঙ্গে শেয়ারবাজারে পতনের সম্পর্কের যে জনশ্রুতি রয়েছে, আমরা তা উড়িয়ে দিতে পারি না। বস্তুত, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নতির স্বপ্ন দেখা কত মানুষের স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছাপ স্পষ্ট। শেয়ারবাজারের এমন পরিস্থিতি আর চলতে দেওয়া যায় না। অস্বীকার করা যাবে না যে, শেয়ারবাজার চাঙ্গা করতে সরকারের দিক থেকে নীতিগত প্রণোদনা কম দেওয়া হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগ এনে শেয়ারবাজারের পতন ঠেকাতে চীনের শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে কৌশলগত অংশীদারিত্ব। কিন্তু কোনো দাওয়াই-ই কাজে লাগছে না কেন? সংখ্যাগরিষ্ঠ বাজার বিশ্নেষকের সঙ্গে আমরা একমত যে, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতাই ধারাবাহিক পতনের মূল কারণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দরপতন রোধ হবে এবং ফের উত্থান ঘটবে- সরকারের পক্ষে এমন নানা আশ্বাসে এখন আস্থা রাখা সত্যিই কঠিন। আমাদের প্রশ্ন, বিনিয়োগকারীরা এভাবে আর কতদিন সর্বস্বান্ত হতে থাকবেন? এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষে আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার অবকাশ নেই। শেয়ারবাজারের দরপতন ঠেকাতে কিছু 'ক্র্যাশ' কর্মসূচি নিতেই হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা খোদ নিয়ন্ত্রণ সংস্থায় পরিবর্তন আনার যে তাগিদ দিয়েছেন, তা বিবেচনার দাবি রাখে। এটা মানতেই হবে যে, শেয়ারবাজার সূচকে অব্যাহত পতন খোদ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরা বিস্মিত যে, ২০১০ সালে শেয়ারবাজার বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে বর্তমান সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশই কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না! বিলম্বে হলেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতেই হবে। আমরা দেখতে চাইব, সংকট মেটাতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সংকটের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থে বিপুলসংখ্যকের বিপর্যয় এবং অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতির এই হতাশাজনক খেলা আর চলতে দেওয়া যায় না।