সতর্কতা ও সহমর্মিতার ঈদুল আজহা

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০     আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২০

সম্পাদকীয়

দুর্যোগের ওপর দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানুষের কাছে এবার ঈদুল আজহা এসেছে এক ভিন্নমাত্রায়। আমরা জানি, এবারের ঈদে পশু কোরবানির স্বাভাবিক উৎসব করার মতো অবস্থায় নেই অনেকেই। একদিকে সাড়ে চার মাস ধরে চলা করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রভাবে অনেকেই কাজ হারিয়েছেন; আয় কমে গেছে অনেক পরিবারের। তার ওপর মাসাধিক কাল ধরে চলা বন্যায় 'বানভাসি মানুষের ঘরে নেই ঈদ আনন্দ'। করোনা মহামারির কারণে কিছুটা কম হলেও সারাদেশে বিরাজ করছে ঈদের আমেজ। কিন্তু এ আমেজ বেশ খানিকটা বিঘ্নিত দেশের বন্যাকবলিত অন্তত একত্রিশ জেলায়। আমরা দেখেছি, দুর্যোগ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে কোরবানির হাটেও। সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, হাটগুলোতে পশু ও ক্রেতা দুই-ই কম। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পশু অবিক্রীত থাকায় খামারিরাও রয়েছেন শঙ্কায়। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুর হাটে কেনাবেচার নির্দেশনা প্রদান করা হলেও কোথাও কোথাও যে ব্যত্যয় ঘটার খবর আসছে, সেটি উদ্বেগজনক। ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ শহরের মানুষের নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা হলেও করোনা সতর্কতায় গত ঈদুল ফিতর থেকেই সে প্রবণতা অনেকটা কম। এবার প্রশাসনের তরফ থেকে চলাচলে কোনো বিধিনিষেধ না থাকলেও গণপরিবহনে যাত্রীর নিরাপত্তায় প্রত্যেককে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। করোনার প্রাদুর্ভাব এখনও অব্যাহত রয়েছে বলে আমরা চাই এ ব্যাপারে প্রশাসন যথাযথ নজরদারি করুক। দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রীদের বসা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা মানা হচ্ছে কিনা সেটি তদারক করতে হবে ঈদের পরও। সমকালের বৃহস্পতিবারের শীর্ষ প্রতিবেদনে এসেছে, 'সংক্রমণ বাড়তে পারে ঈদের পরপর'। আগামী আগস্ট মাসে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিম্নমুখী হওয়ার পূর্বাভাস থাকলেও ঈদ সামনে রেখে কোরবানির পশুর হাট ও ঘরমুখী মানুষের ভিড় এবং সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে না মানার কারণে সংক্রমণ ঝুঁকি আরও বাড়ার যে শঙ্কা বিশেষজ্ঞরা করেছেন, তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই কেবল গণপরিবহন নয়, পশু কোরবানিসহ সব ক্ষেত্রেই সতর্কতা জরুরি। ইতোমধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা নির্দেশনায় ঈদগাহ, খোলা মাঠ বা উন্মুক্ত স্থানের পরিবর্তে মসজিদে এবার ঈদুল আজহার নামাজ পড়ার কথা বলা হয়েছে; বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, ঈদুল আজহার শিক্ষা ভোগের নয়, ত্যাগের। মুসলমানরা এ ঈদের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য, তার সন্তুষ্টি ও মানবকল্যাণে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ প্রদর্শন করে। ত্যাগ ও কোরবানির মধ্যেই যে অনাবিল সুখ, শান্তি ও প্রকৃত সমৃদ্ধি রয়েছে তার প্রতিফলন আমরা সমাজেও দেখতে চাই। প্রতি বছরই সামর্থ্যবানরা কোরবানির পশুর উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবেশী, দরিদ্র ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিলিয়ে দেয়। এবারের দুর্যোগ পরিস্থিতিতে অসহায়ের মাঝে আরও বেশি পরিমাণে মাংস বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থাকা উচিত। কোরবানির পশুর চামড়ার অর্থ সমাজের অসহায় মানুষের অধিকার হিসেবে কোরবানির চামড়ার বাজার রক্ষা করা জরুরি বলেও আমরা মনে করি। গতবারের মতো এবারও কোরবানির চামড়ার বাজার বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। বাজার রক্ষায় এখনই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। যেহেতু দেশীয় বাজারে চাহিদা কম, তাই কাঁচা চামড়া ও লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির জন্য উন্মুক্ত রাখা দরকার। তা ছাড়া চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ ব্যবহার করা হয় বলে লবণের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার পর্যবেক্ষণে রাখাও জরুরি। কোরবানির পশু জবাই, মাংস ও পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা চাই। এ ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা কাম্য। আমরা আবহমান কাল থেকে দেখেছি, দুর্যোগেও জীবন থেমে থাকে না। উৎকণ্ঠার মধ্যেও দেদীপ্যমান থাকে উৎসবের আমেজ। তাই করোনা মহামারি ও বন্যা দুর্যোগের মধ্যেও সমকালের পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ীসহ সবাইকে জানাই ঈদ মোবারক।