স্থানীয় সরকার নির্বাচন

'ভোট উৎসব' ফিরিয়ে আনুন

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২০

সম্পাদকীয়

জাতীয় সংসদের ঢাকা-৫ ও নওগাঁ-৬ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে জনপরিসরে যতটুকুও আলোচনা ছিল, দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের দুই শতাধিক সাধারণ নির্বাচন ও বিভিন্ন পদে উপনির্বাচন নিয়ে তাও ছিল না। এই চিত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য স্বস্তিকর হতে পারে না। দুই শতাধিক পরিষদ ও পদে নির্বাচন এমন 'নীরবে' চলে যাবে, বাংলাদেশে এমন চিত্র এক দশক আগেও ছিল অবিশ্বাস্য। আরও উদ্বেগের বিষয়, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে অধিকাংশ কেন্দ্রেই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি। বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনামেই ফুটে উঠেছে পরিস্থিতি- 'জাল ভোট, কেন্দ্র দখল সবই ছিল'। আমদের প্রশ্ন, তাহলে বাকি থাকলো কী? প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে- নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনকালে এই স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রতিনিধিত্বকারী স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় এর ছিটেফোঁটাও চোখে পড়েনি।

অবস্থাদৃষ্টে প্রতিবেদনের ভাষ্যে 'ছিটেফোঁটা' শব্দটির ব্যবহার অত্যুক্তি হতে পারে না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে শঙ্কার বিপুল ছায়া। জাতীয় সংসদের দুই আসনে সদ্যসমাপ্ত উপনির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে বিরোধী দল ও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তো ছিলই; এখন 'নিরুত্তাপ' স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচনও যদি এভাবে দুর্বৃত্তদের অবারিত প্রান্তরে পরিণত হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভরসার কাচের দেওয়ালটিও যে আর থাকে না! আমরা মনে করি, মঙ্গলবারের স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পরিষদের ভোটগ্রহণ যেভাবে 'সম্পন্ন' হয়েছে, তা আমাদের সবার জন্য 'ওয়েক আপ কল'। এভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, এজেন্ট বের করে দেওয়া এবং সংঘর্ষ ও হামলার খবর গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও জনপ্রতিনিধিত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরও কুফল বয়ে আনবে। এই চিত্র রাজনীতির বাইরে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও হতাশাজনক। স্থানীয় সরকার নির্বাচনও যদি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত না হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নাগরিকরা আস্থা রাখবে কীভাবে? বস্তুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ক্রমাগত ভোটার উপস্থিতির হার কমা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন তো বটেই, সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলকেও ভাবতে হবে। আমরা দেখেছি, শনিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের ঢাকা-৫ আসনে ভোট পড়েছে ১১ শতাংশেরও কম। নওগাঁ-৬ আসনে যদিও কমবেশি ৩৬ শতাংশ ভোট পড়েছে, সেখানে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে যে চিত্র সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তাতে এই হার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মঙ্গলবার স্থানীয় সরকারে বিভিন্ন পরিষদের নির্বাচনে ভোটের গড় হার যদিও এখনও স্পষ্ট নয়, তাও আগের তুলনায় যে কম হবে, এ ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ সামান্য। আমরা দেখেছি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপনির্বাচনেও ভোটারের উপস্থিতি ছিল নগণ্য।

গত বছর মার্চে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটারের স্বাভাবিক উপস্থিতি ছিল না। আমরা চাই, অনাকাঙ্ক্ষিত এই ছায়া থেকে বের হয়ে আসুক বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া। এদেশে ভোট সাধারণ 'উৎসব' বিবেচিত হয়। ঘনিষ্ঠতর সামাজিক সম্পর্কের কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তা তুঙ্গে ওঠে। দুর্ভাগ্যবশত, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এই 'ভোট উৎসব' হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা দেখতে চাই- ভোটারের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নির্বাচন কমিশন ও সরকার আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাক। সেক্ষেত্রে অনিয়ম করে 'নির্বাচিত' হওয়ার যে প্রবণতা স্থানীয় সরকার পর্যায়েও দেখা যাচ্ছে, তা দূর করতেই হবে। এতে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের লাভ হলেও দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা। একই সঙ্গে ভোটারদের আস্থা ফেরাতে অবাধ প্রচারণা, সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। কিন্তু সদ্য সম্পন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। আমরা জানি, নির্বাচনী অনিয়ম নিয়ে মামলার ফলাফল প্রাপ্তিতে থাকে দীর্ঘসূত্রতা। কিন্তু ভোট প্রদানে সাধারণ নাগরিকের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনতে হলে এসব অনিয়মের প্রতিকার করতে হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে। ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য যারাই দায়ী হোক না কেন, সবাইকে আইনের আওতায় আনতেই হবে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কাজটি যত দুরূহই হোক না কেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের স্বার্থে এর বিকল্প নেই।