জঙ্গিবাদের অন্ধকার পথ ছেড়ে আলোর পথে আসা ৯ জনকে বৃহস্পতিবার র‌্যাব সদর দপ্তরে যেভাবে সাদরে গ্রহণ করা হয়েছে, তাকে আমরাও স্বাগত জানাই। ধর্মের নামে উগ্রবাদ কিংবা জঙ্গিবাদ যেমন সমাজে পরিত্যাজ্য, তেমনি ধর্মেও অগ্রহণযোগ্য। সে পথে যারাই পা বাড়িয়েছে, নানাভাবে কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে সমাজচ্যুত সেই অন্ধকার জীবন থেকে নতুন দিগন্তে আসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমরা সংশ্নিষ্টদের সাধুবাদ জানাই। আমরা জানি, জঙ্গিবাদে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় অপব্যাখ্যায় ব্যক্তি বিভ্রান্ত হয়। এ রকম অপব্যাখ্যাকারীদের পাল্লায় পড়ে অনেকে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনে জড়িত হয়। যা থেকে অনেক সময় ফেরার পথ থাকে না। এ ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তারা ফিরে এসেছে। এ সংক্রান্ত শুক্রবারের সমকালের প্রতিবেদনটির শিরোনাম করা হয়েছে ফিরে আসা একজনের স্বীকারোক্তি ধরে- 'যে পথে হেঁটেছি তা ছিল ভুল'। তিনি যথার্থই বলেছেন, 'তরবারির ঝনঝনানি- এটা সেই যুগের কথা। এখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগ, শিক্ষার যুগ। মননশীলতা, চিন্তা-সৃষ্টিশীলতার যুগ। ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবী গড়ে তোলার যুগ। আমরা কেউ যেন ইসলাম নিয়ে ভুল ব্যাখ্যায় প্রভাবিত না হই।' প্রতিবেদনে কয়েকজনের গল্প উঠে এসেছে। তারা প্রত্যেকেই প্রায় একই সুরে কথা বলেছেন। এমনকি তারা চান না অন্যরাও এমন ভুল করুক। আমরা মনে করি, তাদের উপলব্ধি অন্যদেরও সুপথে আনতে সাহায্য করবে।

আমরা দেখেছি, সরাসরি গ্রেপ্তার অভিযানের পথে না গিয়ে অনুপ্রেরণা, উৎসাহ ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে জঙ্গিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসতে সহযোগিতা করছে র‌্যাব। 'ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম'-কে র‌্যাব বলছে 'নবদিগন্তের পথে' আসা। র‌্যাবের এ উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারিত করা উচিত, যাতে করে অন্যরাও অন্ধকারের পথ থেকে ফিরে আসার পথ খুঁজে পায়। আমরা দেখেছি, জঙ্গিরা বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা জায়গায় নিরীহ মানুষের ওপর হামলা করে। ধর্মের নামে এসব নাশকতা যেমন ইসলামবিরোধী, তেমনি সামাজিক মূল্যবোধেরও বিপরীত। রাষ্ট্রীয় আইনবিরোধী এসব কর্মকাণ্ড সভ্যতা ও মানবতার বিপক্ষে। আমরা সত্যিই বিস্মিত- এসব হামলার সহযোগীদের মধ্যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক তথা শিক্ষিতজনও রয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওই অনুষ্ঠানে বলেছেন, তাদের বোঝানো ততটা সহজ ছিল না; কিন্তু সেই কঠিন কাজটি করেছে র‌্যাব। আমরা জানি, যারা উগ্রবাদের সঙ্গে জড়িত তারা যেমন সমাজচ্যুত, তেমনি পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন। অনেক সময় পরিবারকেও তাদের কর্মকাণ্ডের জের বহন করতে হয়। এ রকম বিচ্ছিন্ন থেকে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র পরিবর্তনের চিন্তা যে আকাশকুসুম পরিকল্পনা, তা বলাই বাহুল্য। অনুষ্ঠানে দেওয়া পুলিশ মহাপরিদর্শকের বক্তব্যের সঙ্গে আমরাও একমত- ওই ককটেল, জর্দার কৌটা বা এ জাতীয় জিনিসপত্র দিয়ে কারও বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না। উল্টো তাদের এ নাশকতা রাষ্ট্রকেও বিপদে ফেলতে পারে। আমরা দেখেছি, গুলশানের হলি আর্টিসান হামলার পরও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নেতিবাচক বার্তা গেছে। এটা আমাদের সাফল্য যে, বাংলাদেশ সে অবস্থা কেবল কাটিয়েই ওঠেনি, একই সঙ্গে জঙ্গিবাদকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। অনেক ক্ষেত্রে জঙ্গিদের নাশকতার পরিকল্পনা আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানতে পারছে। আমরা দেখছি, জঙ্গিবাদ থেকে যারা ফিরে এসেছেন, প্রশাসন তাদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করছে। আমরা প্রত্যাশা করি, এখনও যারা বিপথে রয়েছে, তাদের বোধোদয় হবে।

একইসঙ্গে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর বহুমুখী তৎপরতা অব্যাহত রাখবে। এজন্য যেমন গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো দরকার, তেমনি অভিযান জোরদার ও অর্থায়ন বন্ধ করা চাই। সেইসঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে- কারাগারে যেসব জঙ্গি রয়েছে, তারা যেন জামিনে বের হয়ে না যায়। কারাগারের জঙ্গিদেরও র‌্যাবের এ কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো যায় কিনা তা ভেবে দেখা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

মন্তব্য করুন