উপকূলে লবণাক্ততা

সমন্বিত পদক্ষেপের এখনই সময়

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২১

সম্পাদকীয়

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ে শনিবারের সমকালে প্রকাশিত বিশেষ আয়োজনে যে চিত্র স্পষ্ট হয়েছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। খুলনাভিত্তিক লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে তিন দশকে লবণাক্ততা লাঞ্ছিত ফসলি জমির পরিমাণ বেড়েছে ২৬ শতাংশের বেশি। শতাংশের এই হিসাবকে ভূমির পরিমাণে রূপান্তর করলে দেখা যাচ্ছে, সাড়ে ১০ লাখ হেক্টরের বেশি আবাদি জমি এখন, বিশেষ আয়োজনের ভাষ্যমতে 'নুনে খুন' হয়েছে। কেবল ফসলের মাঠ নয়, লবণাক্ততা জীর্ণ বসতবাড়ি ও সেখানকার গাছপালা ও শাক-সবজির হিসাব করে নোনতা মানচিত্র আরও সম্প্রসারিতই হয়। বলা বাহুল্য, ভূমি খুন হলে রক্তাক্ত হয় আমাদের অস্তিত্বই। বস্তুত বিভিন্ন সময়ে 'লোকালয়' পাতায় লবণাক্ততা নিয়ে জীবন ও জীবিকার দুর্ভোগ সংক্রান্ত যেসব খণ্ড খণ্ড ভাষ্য আমরা দেখে থাকি, এই আয়োজনে তারই একটি সার্বিক আলেখ্য। আলোচ্য প্রতিবেদনগুচ্ছ যথার্থই তুলে ধরেছে যে, লবণাক্ততার সংকট নিছক একরৈখিক নয়। উপকূলীয় ১৮ জেলায় কেবল কৃষি উৎপাদন হ্রাস পায়নি; জনস্বাস্থ্য সমস্যা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে উদ্বাস্তু হওয়ার মতো আর্থ-সামাজিক সংকট। আমরা প্রত্যাশা করি, সমকালের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংশ্নিষ্টদের মধ্যে লবণাক্ততা মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ আরও জোরালো হবে। আলোচ্য প্রতিবেদনগুচ্ছে বিশেষজ্ঞদের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আমরা একমত যে, ষাটের দশক থেকে নির্মিত হয়ে আসা উপকূলীয় বাঁধ নেটওয়ার্ক এবং আশির দশক থেকে ওই অঞ্চলের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা চিংড়ি ঘেরই লবণাক্ততা সম্প্রসারণের মূল কারণ। কিন্তু এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক দুর্যোগের বিষয়টিও যোগ করতে হবে। অবশ্য এই সত্য এড়িয়ে যাওয়ার সামান্য অবকাশ নেই যে, অদূরদর্শী বাঁধ এবং নির্বিচার চিংড়ি ঘেরের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সম্প্রসারণসহ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দ্রুততার সঙ্গে গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে।

বিশেষত উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠা পানির প্রবাহ বিলম্বে হলেও নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। আমরা জানি, বঙ্গীয় ব-দ্বীপের পাদদেশবর্তী ওই অঞ্চলে হাজার বছর ধরে ভূমি গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক নিয়মের সুফল হিসেবে। ষাটের দশকে যখন স্লুইসগেট বা পোল্ডার নির্মাণ করা হয়, জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে পলি পড়ে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে গঙ্গায় প্রবাহস্বল্পতার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রবাহিত শাখা নদীগুলোও মরে যেতে থাকে। এর ফলে না জোয়ার-ভাটা, না নদীনির্ভর মৌসুমী বন্যা- পলি প্রক্ষেপণের মাধ্যমে ভূমি উন্নয়নের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আমরা দেখছি, সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের পরম্পরা বেড়ে গেছে। এর ফলে সমুদ্র উত্তাল হওয়া ছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলে ভারী বর্ষণে ফসল হানি ও সাময়িক দুর্যোগ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সর্বাত্মক সতর্কতা ও প্রস্তুতির বিকল্প নেই। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আসলে সমন্বিত পদক্ষেপ। সমকালের বিশেষ আয়োজনে দেখা যাচ্ছে, একদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড যখন উপকূলীয় বাঁধ নেটওয়ার্ক ক্রমেই সম্প্রসারিত করে লবণাক্ততা বাড়িয়ে তুলছে; তখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতের ধান ও অন্যান্য ফসল প্রচলনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রশ্ন, অভিন্ন সরকারেরই দুই সংস্থার এমন বিপরীতমুখী তৎপরতায় সমাধান কীভাবে সম্ভব? এ যেন নৌকার তলা ফুটো করে দিয়ে পানি সেচের মতো পণ্ডশ্রম।

স্বীকার করতেই হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের নীতিগত প্রস্তুতি বিশ্বে উচ্চপ্রশংসিত। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান সরকার টানা তিন মেয়াদের প্রথম থেকেই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বৈদেশিক সাহায্যের অপেক্ষায় না থেকে নিজস্ব তহবিল গঠন করেছে। দুর্যোগ সহনীয় জাতের শস্যজাত উদ্ভাবন ও মাঠে প্রচলনের কাজও চলছে। কিন্তু সব কাজের মধ্যে যদি সমন্বয় না থাকে, যদি অভিন্ন অভিমুখ তৈরি করা না যায়; তাহলে তো সকলই গরল ভেল! আমরা মনে করি, বিলম্ব হলেও সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনগুচ্ছে দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শিকার ম্লান মুখগুলো সেই তাগিদই দিয়ে যাচ্ছে।