নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ

পুরোনো চিত্রের পুনরাবৃত্তি চাই না

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২১

সম্পাদকীয়

করোনা মহামারির প্রভাব মোকাবিলায় সরকার যে আরও দুটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। গত বছর এপ্রিল মাসে যদিও এক লাখ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল, তা ছিল মূলত স্বল্প সুদের ঋণভিত্তিক। কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সেই ঋণ কাঙ্ক্ষিত হারে বিতরণ করা যায়নি। ওইসব প্যাকেজে যদিও কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতও অন্তর্ভুক্ত ছিল; তাদের বেশিরভাগ ব্যাংক ব্যবস্থার সব শর্ত পূরণ করতে পারছিল না। অথচ করোনার অভিঘাত থেকে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে হলে তাদেরই প্রণোদনা প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও প্রণোদনা প্যাকেজের সদ্ব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ বিভাগ আয়োজিত মতবিনিময় সভাগুলোতে অংশীজনদের এই পরামর্শ যথার্থ ছিল যে- ব্যাংক ব্যবস্থার পাশাপাশি কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে সরকারি ও আধা সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ বাড়ানো উচিত। আর শুরু থেকেই প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর সুফল দুস্থ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছিল। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেও আমরা একাধিক দফায় একই সুপারিশ করেছি। এটা স্বস্তির বিষয় যে, শেষ পর্যন্ত কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য যেমন পৃথক প্যাকেজের ব্যবস্থা হলো, তেমনই দুস্থ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্যও ফুটে উঠল আশার আলো। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আমরা বলতে চাই, করোনা পরিস্থিতিতে অতীতের প্যাকেজগুলো নিয়ে যে চিত্র দেখা গিয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।

মনে রাখতে হবে, সর্বব্যাপ্ত করোনা দুর্যোগে দেশের অর্থনীতির সব খাত যখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন তাতে গতি ফেরাতে ব্যবস্থাও হতে হবে সর্বব্যাপ্ত। কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প যদি ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে শুধু বৃহৎ শিল্প দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। কেবল বড়দের নয়, ছোটদের মনোবল বাড়ানোও এ ক্ষেত্রে সমান জরুরি। এও ভুলে যাওয়া চলবে না, প্রণোদনা প্যাকেজের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থায়ন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এর সুচারু বাস্তবায়ন তার চেয়ে বেশি জরুরি। বিশেষত প্রণোদনার অর্থ প্রকৃত প্রাপকের হাতে পৌঁছানোর বিকল্প নেই। আমাদের দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা কেবল নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বাস্তবায়িত কর্মসূচিগুলোর ক্ষেত্রে আমরা যে নয়ছয় দেখে থাকি, সর্বশেষ দুই প্যাকেজের একটিতে তার ছায়াও আমরা দেখতে চাই না। আমাদের মনে আছে, গত বছর এপ্রিলে দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার সময়ই প্রণোদনার অর্থ অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী।

কিন্তু তারপরও একটি মহল এ নিয়ে কীভাবে কারসাজি করেছে, সংবাদমাধ্যমে তা দেখা গেছে। গত সপ্তাহেই সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, ঘোষিত প্রণোদনার ঋণে সুদ আরোপের ক্ষেত্রে অনিয়ম পাওয়া গেছে। প্রণোদনার আওতায় শিল্প ও সেবা খাতে সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণের নির্দেশনা থাকলেও তা মানছে না কোনো কোনো ব্যাংক। বিস্ময়করভাবে দ্বিগুণ সুদ গ্রাহকের ওপর আরোপ করা হচ্ছে। বিষয়টি জানার পর সব ব্যাংককে সতর্ক করে একটি প্রজ্ঞাপন পর্যন্ত জারি করতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন প্রণোদনা প্যাকেজের ক্ষেত্রেও যদি এ ধরনের অনিয়ম দেখা যায়, তার নেতিবাচক প্রভাব হবে দ্বিগুণ। মনে রাখতে হবে, বড় শিল্পের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজের গ্রাহকরা নানাভাবেই 'প্রভাবশালী'।

তাদের ক্ষেত্রেই যখন বিতরণকারীরা অনিয়মের অপচেষ্টা চালিয়েছে, তখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের গ্রাহকদের ঝুঁকি আরও বেশি বৈকি। অবশ্য আশার বিষয় এই- আলোচ্য প্রণোদনা প্যাকেজ বিতরণ করবে রাষ্ট্রায়ত্ত আটটি সংস্থা। যে কারণে তাদের জবাবদিহি বেশি থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টিও ভুলে যাওয়া চলবে না। প্রণোদনার অর্থ যথাসময়ে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতেই হবে। সময়মতো অর্থ হাতে না পাওয়ার কারণে যদি প্রাপকরা তা উৎপাদনমূলক কাজে লাগাতে না পারে, তাহলে তো সকলই গরল ভেল! আর বিপরীতে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্পে যদি প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে প্রত্যাশিত গতি আনতে পারি, তাহলে করোনার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে না।