রোহিঙ্গা সংকট

প্রত্যাবাসনের দায় মিয়ানমারের

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২১

সম্পাদকীয়

মঙ্গলবার বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন এই তিন পক্ষের ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। বুধবার সমকালসহ অন্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, আগামী এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু হতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বৈঠকের পর এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তার ভাষায় জানিয়েছেন, তিনি 'সতর্ক আশাবাদী'। আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের তাৎপর্য বহুলাংশে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে বলে আমরা মনে করি। তবে আমরা এও জানি, অতীতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পাদিত চুক্তি-সমঝোতার ব্যত্যয় ঘটে মিয়ানমারের সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে। আগামী মাসে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ওয়ার্কিং গ্রুপের মধ্যে আরেকটি বৈঠক চীনের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকটি আরও বিস্তৃত পরিসরে হবে এবং ওখানেই প্রত্যাবাসনের মূল রূপরেখা নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিতকরণেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আমরা জানি, ১৯৭৮ ও ৯২ সালে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গারা ফেরত গেলেও সে দেশের সেনাবাহিনীর নিপীড়ন-নির্যাতনে তারা আবার পালিয়ে আসে। এর পর ২০১৭ সাল থেকে সর্বসম্প্রতি ঢেউয়ে সীমান্ত পার হওয়া সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা ছাড়াও আগেই বিভিন্ন সময়ে নির্মমতার মুখে পড়ে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা আশ্রিত ছিল। সব মিলিয়ে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখন খোদ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির জন্যই গুরুতর সংকট হিসেবে আবির্ভূত। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের আশ্রয় শিবিরগুলো থেকে নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে। বস্তুত এর মধ্য দিয়ে একদিকে কক্সবাজারের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে কিছুটা চাপ কমেছে, অন্যদিকে শরণার্থীরাও পেয়েছে অপেক্ষাকৃত উন্নত পরিবেশ। আমরা আশা করি, এই প্রক্রিয়াও চলমান থাকবে। তবে ভুলে যাওয়া চলবে না- ভাসানচর সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত নিপীড়ন-নির্যাতনের কারণে লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছিল। চূড়ান্ত অর্থে তাদের নিরাপদ পরিবেশে মিয়ানমারের ফিরিয়ে নেওয়াই একমাত্র সমাধান। বছরের পর বছর বাংলাদেশ এই বোঝা বইতে পারে না। তা ছাড়া আমরা জানি, কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনেকে ইতোমধ্যে মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, খুন-খারাবিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের একটি অংশ জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদে যে জড়িয়ে পড়েছে- এ ব্যাপারেও সন্দেহ নেই।

কক্সবাজারের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ ও স্থানীয় অধিবাসীদের জীবন-জীবিকায় বিরূপ প্রভাবসহ নেতিবাচক আরও অনেক কিছুই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। নিজ ভূমে নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীর প্রতি আমরা নিশ্চয়ই সহানুভূতিশীল, কিন্তু সীমিত ভূমি ও বিপুল জনসংখ্যার বাংলাদেশের সামার্থ্যের কথাও সর্বাগ্রে বিবেচনায় রাখতে হবে। এই বাস্তবতা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকেও বুঝতে হবে। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখানোর পাশাপাশি তাদের ভালো রাখতেও চালিয়েছে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। তারপরও তাদের একাংশের নানারকম নেতিবাচক কর্মকাণ্ড আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা একাধিকবার এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে লিখেছিও। আমরা আশা করি, চীনের মধ্যস্থতায় নতুন উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জোরালোভাবে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পথ মসৃণ করতে উদ্যোগী হবে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী পক্ষগুলো সে মোতাবেক মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, যাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রোডম্যাপ বাস্তবায়নে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বহুল প্রত্যাশিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। আমরা জানি, মিয়ানমার বারবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে চললেও কার্যক্ষেত্রে সে রকম কিছুই দৃশ্যমান নয়। এবার আমরা এর পুনরাবৃত্তি চাই না। বাংলাদেশের সদিচ্ছা অবারিত হলেও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমলে নিতে জোরদার কূটনৈতিক প্রয়াসও আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে।