আদালতে বাংলা ভাষায় রায় প্রদানের জন্য বিচার বিভাগ ও সরকারের পক্ষ থেকে ইংরেজি শব্দের বাংলা পরিভাষা প্রণয়নে জোর দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সাড়ে ৪ হাজার নতুন বাংলা পরিভাষাসহ ১০ সহস্রাধিক বাংলা পরিভাষা নিয়ে আইন কমিশন যে 'আইন শব্দকোষ' প্রণয়ন করেছে, তা স্বাগত। বুধবার সমকালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে আমরা আরও দেখেছি, ইংরেজিতে রায় ও আদেশ অনুবাদের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় 'বাংলা অ্যাপ'ও তৈরি হয়েছে। উভয় উদ্যোগই বাংলা ভাষায় আদালতের রায় প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। বস্তুত দেশের অধস্তন আদালতের বিচারকাজে বাংলা ভাষা ব্যবহূত হলেও উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় বিরল। এ ক্ষেত্রে ইংরেজি শব্দের বাংলা পরিভাষা না থাকার যে কারণ এতদিন দেখানো হয়েছে; 'আইন শব্দকোষ' প্রণয়নের মাধ্যমে তার সমাধান মিলল। সমকালের কাছে আইনমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, 'বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়াটা শুধু জরুরি নয়, অত্যাবশ্যক। কারণ দেশের নাগরিক, বিশেষ করে যারা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন, তাদের করা মামলার রায় ও আদেশ মাতৃভাষায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। তা ছাড়া আমরা বহু আগেই ঔপনিবেশিক আমল পেরিয়ে এসেছি। তাই সেই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসাও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।' ইতোপূর্বে প্রধানমন্ত্রীও বিচারপতিদের বাংলা ভাষায় রায় প্রদানের ওপর জোর দিয়েছেন।

এটি সত্যিই হতাশাজনক যে, সংবিধানে স্পষ্টভাবে 'প্রজাতন্ত্রের ভাষা হবে বাংলা' বলা থাকলেও উচ্চ আদালতে সেটি প্রায় অনুপস্থিত। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের বিধিতে আদালতের ভাষা হিসেবে প্রথমে বাংলা, পরে অন্য ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও উচ্চ আদালতের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারে এতদিন তেমন কার্যকর উদ্যোগ আমরা দেখিনি। এখন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের 'বাংলা অ্যাপ' তৈরির তৎপরতা সাধুবাদযোগ্য। পরিভাষার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যে কয়েকজন বিচারপতি ব্যক্তিগত আগ্রহে বাংলায় রায় দিচ্ছেন, তাদেরও আমরা ধন্যবাদ দিতে চাই। তারা অন্যদের জন্যও অনুকরণীয়। আমরা মনে করি, ইচ্ছা থাকলে যে কোনো সময় উচ্চ আদালতের সর্বস্তরে এর ব্যবহার শুরু করা অসম্ভব নয়। আমরা জানি, ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনেও বলা হয়েছে, 'আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনগত কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে।' আমরা জানি, বঙ্গবন্ধুও সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের কথা বলেছিলেন। তখন থেকেই বাংলায় রায় দেওয়া হলে বাংলায় ইংরেজির পরিভাষা ব্যবহার আরও গতিশীল হতো। দেরিতে হলেও বাংলা ভাষায় আদালতে রায় প্রদানের বিষয়টি সুরাহা হোক।

একই সঙ্গে 'আইন শব্দকোষ' প্রণয়ন ও 'বাংলা অ্যাপ' তৈরির মাধ্যমে পরিভাষাগত জটিলতারও অবসান ঘটবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থী প্রায় সবাইকে আইনজীবীদের দ্বারস্থ হতে হয়। মামলা নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার পেতে মানুষের ভোগান্তির অবসানের জন্যই বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। আমরা জানি, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডসের মতো বিশ্বের অনেক দেশেই মাতৃভাষায় বিচারকাজ সম্পন্ন হয়। বস্তুত, বাংলা ভাষায় রায় পাওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এ অধিকার প্রদানে বিচারপতিদের স্বতঃস্ম্ফূর্ত ভূমিকা প্রত্যাশিত। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা এভাবে উপেক্ষিত থাকলে দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন অধরাই থেকে যাবে। উচ্চ আদালতে বাংলার প্রচলন হলে আমাদের যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা রয়েছে, বাংলা ভাষা প্রচলনে যে আইন রয়েছে; সর্বত্র সে আইন বাস্তবায়নেও আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই বাংলায় আদালতের রায় প্রদানের প্রভাব পড়বে দেশের সর্বস্তরে। এ ক্ষেত্রে আদালত সচেষ্ট হবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।

মন্তব্য করুন