চকচক করলেই যে সোনা হয় না- সেই আপ্তবাক্য কে না জানে! তবুও চাকচিক্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ যেন চিরন্তন। 'সভ্যতা' যত এগিয়েছে, চকচকে করে তোলা বস্তু ও ভাবের তালিকা তত দীর্ঘ হয়েছে। আবাস থেকে আসবাব, পথচলার গাড়ি থেকে কোরবানির গরু, পণ্যের মোড়ক থেকে খেলার মাঠ- সবই যেন আগে দর্শনধারী, তারপর গুণবিচারি। মানুষেরও প্রথম দর্শনে বাজিমাত করতে হলে এখন কেবল পরিধেয় নয়, কথাবার্তাও হতে হবে ঝাঁ চকচকে। এখন দেখা যাচ্ছে- খোদ খাদ্যদ্রব্যও এই আপাত নিরীহ প্রবণতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সবুজ বিপ্লবের হাত ধরে এসেছে আরও 'চকচকে' কৃষি প্রযুক্তি জিন-প্রকৌশল। এর মধ্য দিয়ে আমরা বদখত বেগুনের ত্বক মাগুর মাছের মতো মসৃণ করে ফেলেছি; এমন টমেটো তৈরি হয়েছে, যা দিনের পর দিন ধরে রাখতে পারে একই ঔজ্জ্বল্য। সবচেয়ে বেশি 'ক্যারিশমা' দেখিয়ে চলছে সম্ভবত ধান। আমরা সংকরায়নের কথা বলছি না। স্বীকার করতে হবে, এক শতাব্দী আগেও অবিভক্ত বঙ্গে পনেরো হাজার জাতের ধান-বৈচিত্র্য ছিল। কালের বিবর্তনে আমরা সেই ধান-বৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলেছি এবং এখন ফসলের ক্ষেত্রে সংকর কিংবা বিদেশি জাতের ধানেরই জয়জয়কার। কিন্তু এও অস্বীকার করা যাবে না যে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে হলে যে কোনো মূল্যে প্রধান খাদ্যশস্য ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প ছিল না। কেবল ধান নয়; শাক থেকে সবজি, পাট থেকে পেয়ারা- সব ক্ষেত্রেই এখন সংকরায়ন ও জিন-প্রকৌশলের 'জয়'। ধানেও কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি দিয়ে চলছে না; ধানের চিরায়ত গুণাগুণের সঙ্গে অন্যান্য খাদ্যপ্রাণ ও পুষ্টি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে জিন-প্রকৌশলের মাধ্যমে। নতুন নতুন নামে নতুন নতুন গুণের ধান পাচ্ছি আমরা। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়েও কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই রয়েছে বিপুল বিতর্ক। কিন্তু বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানী ও বিতার্কিকরা হোঁচট খেয়ে যেতে পারেন বাংলাদেশে উৎপাদিত একটি ধানের 'জাত' নিয়ে। অবশ্য ধান নয়, বলা ভালো চালের জাত। যে প্রজাতির ধান হিসেবেই মাঠ থেকে উঠে আসুক না কেন, চালকলের ভেতরে প্রবেশের পর এর অভিন্ন পরিচয় হয় 'মিনিকেট'।

দেশজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় চাল হিসেবে কয়েক দশক চলার পর এখন জানা যাচ্ছে- এই নামে কোনো ধানের জাত নেই। মোটা চাল সরু ও সাদা করে তোলার স্বার্থেই কেটে ফেলা হয় স্বয়ংক্রিয় চালকলে। বিজ্ঞানীরা বলেন, চালের মূল পুষ্টিগুণ থাকে খোসার নিচের পাতলা আবরণে। যে কারণে চালকলে ছাঁটা চালের বদলে ঢেঁকিছাঁটা চালের গুণাগুণ বেশি বলে মনে করা হয়। কিন্তু মিনিকেট নামে যে সরু চাল তৈরি হয়, তাতে শর্করা ছাড়া আর কিছু থাকে বলে মনে হয় না। তার মানে, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী তিনবেলা কেবল শর্করাতেই পেট ভরাচ্ছে, পুষ্টি পাচ্ছে না! নিছক 'চকচকে' করে তোলার স্বার্থে এমন আত্মঘাতী প্রবণতা বিশ্বের আর কোথাও রয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। মন্দের ভালো যে, বিলম্বে হলেও খোদ খাদ্যমন্ত্রী বুধবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন চাল খাওয়ার ব্যাপারে ভোক্তাদের নিরুৎসাহিত করেছেন। আমরা দেখতে চাই, এর উৎপাদন বন্ধেও নেওয়া হয়েছে ব্যবস্থা। জনসচেতনতার প্রয়োজনীয়তা আমরা অস্বীকার করি না। কারণ খাদ্যপণ্য চকচকে করে তোলার নানা রাসায়নিক কারসাজি ভোক্তা চাহিদার পথ ধরেই বাজারে এসেছে। কিন্তু বাজারে যদি চকচকে চাল থাকেই, জীবন ও যাপনের অন্যান্য ক্ষেত্রে চকচকে বস্তু ও ভাবের প্রতি আকষর্ণ বোধ করা ভোক্তাদের কি ঠেকানো যাবে? অন্যান্য কৃষিপণ্যেও এমন অহেতুক কারসাজি বন্ধ করা দরকার। কিন্তু জরুরি কাজটি প্রধান খাদ্যশস্য থেকেই সূচিত হোক। চকচক করলেই যে সোনা হয় না- সেই আপ্তবাক্য কে না জানে! তবুও চাকচিক্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ যেন চিরন্তন।

'সভ্যতা' যত এগিয়েছে, চকচকে করে তোলা বস্তু ও ভাবের তালিকা তত দীর্ঘ হয়েছে। আবাস থেকে আসবাব, পথচলার গাড়ি থেকে কোরবানির গরু, পণ্যের মোড়ক থেকে খেলার মাঠ- সবই যেন আগে দর্শনধারী, তারপর গুণবিচারি। মানুষেরও প্রথম দর্শনে বাজিমাত করতে হলে এখন কেবল পরিধেয় নয়, কথাবার্তাও হতে হবে ঝাঁ চকচকে। এখন দেখা যাচ্ছে- খোদ খাদ্যদ্রব্যও এই আপাত নিরীহ প্রবণতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সবুজ বিপ্লবের হাত ধরে এসেছে আরও 'চকচকে' কৃষি প্রযুক্তি জিন-প্রকৌশল। এর মধ্য দিয়ে আমরা বদখত বেগুনের ত্বক মাগুর মাছের মতো মসৃণ করে ফেলেছি; এমন টমেটো তৈরি হয়েছে, যা দিনের পর দিন ধরে রাখতে পারে একই ঔজ্জ্বল্য। সবচেয়ে বেশি 'ক্যারিশমা' দেখিয়ে চলছে সম্ভবত ধান। আমরা সংকরায়নের কথা বলছি না। স্বীকার করতে হবে, এক শতাব্দী আগেও অবিভক্ত বঙ্গে পনেরো হাজার জাতের ধান-বৈচিত্র্য ছিল। কালের বিবর্তনে আমরা সেই ধান-বৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলেছি এবং এখন ফসলের ক্ষেত্রে সংকর কিংবা বিদেশি জাতের ধানেরই জয়জয়কার। কিন্তু এও অস্বীকার করা যাবে না যে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে হলে যে কোনো মূল্যে প্রধান খাদ্যশস্য ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প ছিল না। কেবল ধান নয়; শাক থেকে সবজি, পাট থেকে পেয়ারা- সব ক্ষেত্রেই এখন সংকরায়ন ও জিন-প্রকৌশলের 'জয়'। ধানেও কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি দিয়ে চলছে না; ধানের চিরায়ত গুণাগুণের সঙ্গে অন্যান্য খাদ্যপ্রাণ ও পুষ্টি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে জিন-প্রকৌশলের মাধ্যমে। নতুন নতুন নামে নতুন নতুন গুণের ধান পাচ্ছি আমরা। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়েও কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই রয়েছে বিপুল বিতর্ক। কিন্তু বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানী ও বিতার্কিকরা হোঁচট খেয়ে যেতে পারেন বাংলাদেশে উৎপাদিত একটি ধানের 'জাত' নিয়ে। অবশ্য ধান নয়, বলা ভালো চালের জাত। যে প্রজাতির ধান হিসেবেই মাঠ থেকে উঠে আসুক না কেন, চালকলের ভেতরে প্রবেশের পর এর অভিন্ন পরিচয় হয় 'মিনিকেট'। দেশজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় চাল হিসেবে কয়েক দশক চলার পর এখন জানা যাচ্ছে- এই নামে কোনো ধানের জাত নেই। মোটা চাল সরু ও সাদা করে তোলার স্বার্থেই কেটে ফেলা হয় স্বয়ংক্রিয় চালকলে।

বিজ্ঞানীরা বলেন, চালের মূল পুষ্টিগুণ থাকে খোসার নিচের পাতলা আবরণে। যে কারণে চালকলে ছাঁটা চালের বদলে ঢেঁকিছাঁটা চালের গুণাগুণ বেশি বলে মনে করা হয়। কিন্তু মিনিকেট নামে যে সরু চাল তৈরি হয়, তাতে শর্করা ছাড়া আর কিছু থাকে বলে মনে হয় না। তার মানে, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী তিনবেলা কেবল শর্করাতেই পেট ভরাচ্ছে, পুষ্টি পাচ্ছে না! নিছক 'চকচকে' করে তোলার স্বার্থে এমন আত্মঘাতী প্রবণতা বিশ্বের আর কোথাও রয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। মন্দের ভালো যে, বিলম্বে হলেও খোদ খাদ্যমন্ত্রী বুধবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন চাল খাওয়ার ব্যাপারে ভোক্তাদের নিরুৎসাহিত করেছেন। আমরা দেখতে চাই, এর উৎপাদন বন্ধেও নেওয়া হয়েছে ব্যবস্থা। জনসচেতনতার প্রয়োজনীয়তা আমরা অস্বীকার করি না। কারণ খাদ্যপণ্য চকচকে করে তোলার নানা রাসায়নিক কারসাজি ভোক্তা চাহিদার পথ ধরেই বাজারে এসেছে। কিন্তু বাজারে যদি চকচকে চাল থাকেই, জীবন ও যাপনের অন্যান্য ক্ষেত্রে চকচকে বস্তু ও ভাবের প্রতি আকষর্ণ বোধ করা ভোক্তাদের কি ঠেকানো যাবে? অন্যান্য কৃষিপণ্যেও এমন অহেতুক কারসাজি বন্ধ করা দরকার। কিন্তু জরুরি কাজটি প্রধান খাদ্যশস্য থেকেই সূচিত হোক।

মন্তব্য করুন