রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তথা রাজউক সব ধরনের আধুনিক নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন পূর্বাচল উপশহর প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বললেও তাতে কাটাছেঁড়া করে যেভাবে স্কুল, পার্ক, জলাধার ও খেলার মাঠ বাদ দেওয়ার খবর শুক্রবারের সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে, তাতে আমরা হতাশ হলেও বিস্মিত নই। বস্তুত রাজউক ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকল্পটিকে পরিকল্পিত ও আন্তর্জাতিক মানের দাবি করা হলেও এখনই মানের অনেক দিক থেকে যেসব ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, তা আরও বাড়বে বলেই আমাদের ধারণা। এমনকি রাজউক যে ভিত্তিকে মানদণ্ড ধরে আবাসন প্রকল্পের নীতিমালা তৈরি করেছে, তার অনুসরণ না করাটা দুঃখজনক। আমরা দেখেছি, কেবল পূর্বাচল উপশহরের ক্ষেত্রেই নয়, রাজউকের বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প, উত্তরা (তৃতীয় পর্ব) প্রকল্প ও উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কোনোটিতেই মানদণ্ড সেভাবে অনুসরণ করা হয়নি। আগে বাস্তবায়িত উত্তরা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের অবস্থাও যদি একই হয় তাহলে রাজউকের মানদণ্ডের প্রয়োজন কী? আমরা জানি, রাজউকের মানদণ্ড অনুসারে উপশহর বা পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার জন্য ৫০ একরকে একটি ইউনিট ধরে সাড়ে ১২ হাজার মানুষের বাসস্থানের সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাইস্কুল, পার্ক, জলাধার, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার, কমিউনিটি ক্লাব তথা নাগরিক সুবিধা, চিত্তবিনোদনসহ সব ধরনের বিষয়ের উল্লেখ কেবল কাগজেই আছে। এমনকি ডাকটাইল লেনের মধ্যে তথা একটি বড় পাইপের মধ্য দিয়ে পানি, স্যুয়ারেজ, ইন্টারনেট, টেলিফোন, কেবল টিভি লাইন, বিদ্যুৎসহ সেবা সুবিধা সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিক সেবা সংযোগ দেওয়ার কথা থাকলেও পূর্বাচলে সেটি অনুসরণ করা হয়নি।

সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বাচলে বিদ্যুতের লাইনও দেওয়া হচ্ছে খুঁটি দিয়ে। এমনকি প্রকল্পটিতে যে পাঁচবার লে-আউট প্ল্যান সংশোধন করা হয় তার প্রতিবারই সুবিধা আরও কমানো হয়। কারণটি অবশ্য পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্যেই স্পষ্ট। ১৫ লাখ মানুষের বসবাসের কথা বলা হলেও এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তবে তিনি যে ঢাকা শহরের অন্যান্য জায়গার কথা বলেছেন এবং সেখানে প্রয়োজনীয় স্কুল-কলেজ-পার্ক-মাঠের প্রশ্ন তুলেছেন, তা কতটা যৌক্তিক? সে তুলনায় পূর্বাচলে অনেক বেশি স্কুল-কলেজ থাকবে বটে কিন্তু সেটি তো আর রাজউকের মান অনুযায়ী হলো না। যে পূর্বাচলে ১০ লাখ মানুষের বসবাসের কথা চিন্তা করে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেখানে যদি জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে সুযোগ-সুবিধা তো কমাতেই হবে। কিন্তু তা কতটা গ্রহণযোগ্য? আমরা দেখেছি, অন্যান্য আবাসন প্রকল্পেও স্কুল-কলেজ-খেলার মাঠ ওই অনুপাতে নেই। ফলে আবাসিক ভবনের মধ্যেই যেভাবে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা হচ্ছে তা নিঃসন্দেহে পরিকল্পিত আবাসনের উদাহরণ নয়। রাজউক যদি সত্যিই পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প তৈরি করতে চায় সে ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রভাবশালীদের চাপ এড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য পারিপার্শ্বিক বিষয়ও সংস্থাটিকে দেখতে হবে। তার চেয়ে বড় বিষয়, দুই যুগের বেশি সময় হয়ে গেলেও পূর্বাচল উপশহরের কাজ এখনও শেষ হয়নি।

আমরা মনে করি, প্রকল্পের কাজে ধীরগতি হলে একদিকে যেমন প্রকল্প ব্যয় বাড়বে, তেমনি এর বিশাল এলাকার নানা জায়গায় বেদখল হওয়ার শঙ্কাও থাকবে। এবং একই সঙ্গে লে-আউট পরিকল্পনাও বারবার বদলাতে হবে। তাতে নাগরিক সুবিধা কিংবা পরিকল্পিত আবাসন হুমকির মুখে পড়বে। মনে রাখা দরকার, ঢাকা শহর যখন সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু, যখন প্রতিদিনই বাড়ছে ঢাকামুখী জনস্রোত তখন সবার জন্য সুন্দর আবাসন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এ জন্য ঢাকা বিকেন্দ্রীকরণের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে হবে। তবে রাজউকের মতো প্রতিষ্ঠান যদি তার মানদণ্ড অনুসারে একটিও আবাসিক প্রকল্প গড়তে না পারে সেটি দুঃখজনক। সংস্থাটি যদি নিজেই নিজের মানদণ্ড রক্ষা করতে না পারে সেখানে অন্য আবাসিক প্রকল্পের দুর্গতি আমাদের বোঝা কঠিন নয়। আমরা বিশ্বাস করি, সরকারি সংস্থা হিসেবে রাজউক চাইলে এখনও যে পরিকল্পনা নিয়ে পূর্বাচল উপশহর প্রকল্প শুরু করেছে, তা পূরণ করা অসম্ভব হবে না।

মন্তব্য করুন