বাজারে কয়েক মাস ধরে ভোজ্যতেলের দামের ঊর্ধ্বগতির পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার সরকারের দাম বেঁধে দেওয়ায় যে উল্টো ফল দেখছি, তাতে আমরা বিস্মিত। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করেননি, এমনকি বেশিরভাগ কোম্পানির তেল বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব ভোজ্যতেলে যে কঠোর নজরদারির দাবি তুলেছে, তার সঙ্গে আমরা বহুলাংশে একমত। নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করতে মাঠ পর্যায়ে যথাযথ নজরদারিতে ঘাটতি হলে এ উদ্যোগের সুফল মানুষ পাবে না বলে আমরা মনে করি। এমনিতেই সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দেশের ট্যারিফ কমিশনের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাড়তি মূল্যে প্রকারান্তরে সরকারের স্বীকৃতি নিয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী নির্ধারিত মূল্যে ভোজ্যতেল বিক্রি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও বাস্তবে ভোক্তারা বাজারে গিয়ে হতাশ। এ ক্ষেত্রে বাজার তদারকি না করলে কিংবা ব্যবসায়ীদের কারসাজি রয়েছে কিনা তা খতিয়ে না দেখলে ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

ভোজ্যতেলের অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাঁচ ভাগের চার ভাগই আমদানি করতে হয় এবং গুটিকয়েক কোম্পানি এ তেল আমদানি করে বলে এ ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট করা অসম্ভব নয়। এ সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং তেলের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে কেবল সাত-আটটি নয়, আরও অধিক প্রতিষ্ঠানকে আমদানির সুযোগ দিতে হবে। আমরা দেখেছি, বাজারে কেবল ভোজ্যতেলের দাম বাড়তি নয়; নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যেরই দাম ঊর্ধ্বমুখী। কয়েক মাস ধরে চাল, ডাল, পেঁয়াজসহ নানা নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে চালের বাজার বেসামাল হয়ে পড়েছে। বাজারে মোটা চালের দামই এখন কেজিপ্রতি ৫৪-৫৬ টাকা। নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এমনকি অনেক মধ্যবিত্তের জীবন যাপনও সংকটে পড়েছে। এমনিতেই করোনা পরিস্থিতিতে অনেকের আয় কমেছে। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা খরচ, যোগাযোগ ব্যয়, বাজারের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা কারণে অনেক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। এ অবস্থায় নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি অনেকের কাছেই 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'। আমরা দেখেছি, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের দায়িত্বশীলরা নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। আমরা জানি, মার্চ মাস পাম ও সয়াবিন তেল উৎপাদনের মৌসুম। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

এমতাবস্থায় আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে ভোজ্যতেলের দাম বাড়বে না। বিশেষ করে রমজানে ভোজ্যতেল, ছোলা, চিনি, মসলাসহ অনেক নিত্যপণ্যের চাহিদা বেশি থাকায় প্রায় প্রতি বছর দাম বেড়ে যায়। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার যদি আগে থেকেই সতর্ক থাকে, তাহলে রমজানে বাজার স্বাভাবিক থাকবে। গত বছর আমরা দেখেছি, অনেক ব্যবসায়ী রমজানে পেঁয়াজ গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিল। সরকার সবদিক থেকে সজাগ থাকলে এর পুনরাবৃত্তি সম্ভব হবে না বলে আমরা মনে করি। রমজানে ভোজ্যতেল নিয়ে যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য এখন থেকেই আমদানি, বিতরণ ও ভোক্তা পর্যায়ে বিপণনে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া পেঁয়াজের মতো কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে সরিষার উৎপাদন বাড়িয়ে সরিষার তেল উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির সক্রিয়তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষের সুবিধার্থে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে টিসিবি যে ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য বিক্রি করে, এর আরও সম্প্রসারণ প্রয়োজন। আমরা দেখেছি, গত সপ্তাহে খোদ টিসিবি তাদের বোতলজাত সয়াবিন তেল ও মসুর ডালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনটি তো কাম্য হতে পারে না। আমরা চাই, সরকার বাজারের পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে তদারকির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখুক।

মন্তব্য করুন