বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি প্রতিবছর যেভাবে বিদ্যুতে লোকসান দিয়ে যাচ্ছে, তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বুধবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করায় পিডিবির লোকসান বাড়ছে। এমনকি চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল আট হাজার কোটি টাকা। পিডিবি যদিও মার্কিন ডলারের তুলনায় বাংলাদেশি টাকার অবমূল্যায়ন এবং করোনা সংকটের মধ্যে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো চিঠিতে জানিয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, আরও বহুবিধ কারণে পিডিবিকে এই ধারাবাহিক লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে আমরা দেখছি, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্বৃত্ত থাকলেও এমনকি বেসরকারি অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ না নিলেও সেগুলোর ক্যাপাসিটি পেমেন্ট তথা বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও যে ভাড়া সরকারকে দিতে হচ্ছে, সে কারণেই লোকসান বাড়ছে। ২০১৯ সালের শেষ দিকে সমকালের এক প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, এই চার্জ বাবদ সরকারকে ১২ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের ৫০ হাজার কোটির বেশি টাকা দিতে হয়েছে। আমরা দেখছি, তা-ই এখনও সরকার দিয়ে যাচ্ছে। একসময় বিদ্যুতের ব্যাপক ঘাটতি মেটাতে সরকার ভাড়াভিত্তিক রেন্টাল-কুইকরেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু এখন ঘাটতি না থাকলেও সেগুলো স্থায়ী হয়ে যাওয়া এবং মাসে মাসে সরকারি তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ২০১৯ সালে আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে বছর বছর এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নবায়নের ব্যাপারে সরকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। সেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনও কেন নবায়ন করে লোকসান গুনছে? আমরা এও দেখছি, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উদ্বৃত্ত হলেও সরকার বেশি দামে ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনা অব্যাহত রেখেছে। এর ফলেও পিডিবির লোকসান দিন দিন বেড়ে চলেছে। এভাবে বিদ্যুতে অদূরদর্শী নীতির ফলে লোকসান যত বাড়বে, ততই ভোক্তারা চাপে পড়বে। গত বছরও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। গত ১০ বছরে সরকার ১০ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন- তিন ক্ষেত্রেই তখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। বিদ্যুৎ খাতে 'অযৌক্তিক' ব্যয় না কমিয়ে জনগণের ব্যয়ভার বাড়ানো কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। এটা ঠিক, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে সরকার এলএনজি আমদানি কমিয়ে দেওয়ার ফলে গত বছরের অক্টোবর থেকে গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে রেশনিং করা হচ্ছে বলে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে পিডিবি বেশি করে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এই বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট পাঁচ টাকায় কিনে অর্ধেক দামে পিডিবি বিক্রি করছে। পিডিবির সঙ্গে আমাদেরও প্রত্যাশা, পারমাণবিক ও কয়লাভিত্তিক বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে মার্চ থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বাড়লে লোকসান কমতে পারে। কিন্তু আমাদের অবশ্যই অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিতে হবে। শহর-গ্রাম সব ক্ষেত্রেই মানুষ এখন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সভ্যতা বিদ্যুৎ ছাড়া অকল্পনীয়। সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সবার ঘরে প্রায় বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। পাওয়ার সেলের তথ্য অনুযায়ী যেখানে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী নিরানব্বই ভাগ, সেখানে বিদ্যুতে আমাদের সফলতার কথা বলতেই হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, বিদ্যুৎ যেমন মানুষের জীবন সহজ করেছে, তেমনি সহজেই যেন এটি সবাই ব্যবহার করতে পারে- সরকার তা নিশ্চিত করবে। এ ক্ষেত্রে পিডিবির অব্যাহত লোকসান যে কোনো মূল্যে কমাতেই হবে। যেখানে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব, সেখানে অযৌক্তিক ব্যয় কাম্য নয়। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নবায়নের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। আমাদের বিশ্বাস, পিডিবি লোকসান কমিয়ে ভবিষ্যতে অযৌক্তিকভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো থেকে বিরত থাকবে।

মন্তব্য করুন