দেশের উপকূলীয় বনাঞ্চলে বনখেকোদের বৃক্ষ নিধনের ঘটনা নতুন নয়। সুযোগ পেলেই ওই অশুভ চক্র যেভাবে বনের মূল্যবান গাছ গিলে খাচ্ছে, তাতে কেবল উপকূলীয় বনই উজাড় হচ্ছে না, একই সঙ্গে বিঘ্নিত হচ্ছে সবুজ বেষ্টনীর নিরাপত্তাও। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার বনাঞ্চল উজাড়ের বিষয়টি উঠে এলেও এমন খবর সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বিভিন্ন সময়েই আমরা জেনে থাকি। যারা উপকূলীয় বৃক্ষ নিধনের সঙ্গে জড়িত আমরা দেখেছি, তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে প্রভাবশালী। যারা সরকারের সবুজ বেষ্টনী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে, তারা কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে- এমন প্রশ্নও নতুন নয়। আমরা জানি, বিশেষত সত্তরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর উপকূল অঞ্চলে বনায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। এ লক্ষ্যে ওই সময় ম্যানগ্রোভ জাতীয় বৃক্ষ রোপণের কাজ সীমিত আকারে করলেও ১৯৭৭ সালে উপকূল অঞ্চলে প্রায় আট হাজার একর জমিতে বনায়ন করা হয়। ফলে আশির দশকের গোড়ার দিকে বনভূমির পরিমাণ দাঁড়ায় লক্ষাধিক একরে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বে সর্বপ্রথম সফল উপকূলীয় বনায়নকারী দেশ। বন বিভাগ কর্তৃক উপকূলীয় বনায়নের সফলতা প্রত্যক্ষ করে সরকার উপকূলীয় ১২ লাখ ৩৬ হাজার একর এলাকা বনায়নের লক্ষ্যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর ও বন আইনের ৪ ধারায় সংরক্ষিত ঘোষণা করেছে। বন বিভাগ ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ একর চরাঞ্চলে বনায়নের মাধ্যমে নয়নাভিরাম উপকূলীয় বন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এটিই বিশ্বে সর্ববৃহৎ উপকূলীয় বনায়ন কার্যক্রম। উপকূলীয় বনায়নের বহুবিধ উপকারিতা আমরা দেখেছি। এর ফলে ইতোমধ্যে হাজার হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদ এবং বসবাসের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে। তাছাড়া সবুজ বেষ্টনী হিসেবে উপকূলীয় বন প্রত্যক্ষভাবে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে লাখ লাখ জীবন ও সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে ভূমিকা রাখে। এমনকি 'মোরা', 'আইলা' 'নার্গিসে'র মতো দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হ্রাসেও উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনীর ভূমিকা ছিল অনন্য। একই সঙ্গে উপকূলীয় বনায়ন নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও ভোলা উপকূলীয় জেলায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আমরা মনে করি, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী দুর্যোগের ঢালস্বরূপ। এই বেষ্টনীর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ করতে না পারলে তা উপকূলীয় মানুষের জন্যই নয়, সার্বিকভাবেই আত্মঘাতী হবে।

সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় ৫০ হাজার একর এলাকাজুড়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে। এ ছাড়া উপকূল এলাকার চরগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে বিস্তার ঘটেছে বনাঞ্চলের। কিন্তু বনখেকোরা নানা অজুহাতে বনাঞ্চল কেটে সাবাড় করছে। আমরা চাই, এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ জোরালো ভূমিকা রাখুক। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা দেখছি ওই বনের জমি নিয়ে বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের এক ধরনের অভাব রয়েছে। সেখানকার বন বিভাগ বলছে, ওই জমি বন বিভাগের নয়। সরকারের ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হিসেবে ওই জমির দেখভাল করার দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। আর জেলা প্রশাসনের বক্তব্য হলো, উপকূলে বনাঞ্চল করার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে বন বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি লিজ নেয় এবং সব বনাঞ্চলের দেখভাল করার দায়িত্বও বন বিভাগের।

আমরা মনে করি, বন বিভাগ কিংবা জেলা প্রশাসন উভয়েরই উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী রক্ষায় সচেষ্ট থাকতে হবে। প্রয়োজনে উভয় কর্তৃপক্ষ পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার উপকূলীয় বনের গাছ কারা কাটছে, তা কর্তৃপক্ষ খুঁজে বের করে অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করবে- এটি আমাদের প্রত্যাশা। উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনীর বৃক্ষ নিধন লাল তথা বিপদ সংকেত। সামষ্টিক স্বার্থেই যেখানে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী রক্ষা করতে হবে, সেখানে কোনোভাবেই সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের নির্বিকার থাকার কোনো সুযোগ নেই।

মন্তব্য করুন