বাংলাদেশের কৃষকের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন নয়। বন্যা-খরা, ঝড়-বৃষ্টি, বালাই মোকাবিলা করেই তারা দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। করোনাভাইরাসের মতো নতুনতর বৈশ্বিক দুর্যোগেও যখন উৎপাদন ব্যবস্থার সবদিক থমকে গিয়েছিল; তখনও কৃষিই ভরসা জুগিয়েছে আমাদের। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই গত বোরো, আউশ ও আমন মৌসুমের মতো এবারের বোরো মৌসুমে কৃষক দুঃসময়ের মধ্যেও যখন সোনালি দিনের অপেক্ষায় ছিলেন, তখন এসেছে নজিরবিহীন আঘাত। বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাচ্ছে, গত রোববার রাতে দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে প্রচণ্ড ঝড়ের সঙ্গে গরম বাতাস বয়ে যাওয়ার পর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে উঠতি বোরো ধান চিটায় পরিণত হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে ধানগাছের সবুজ পাতা ও শীষ বিবর্ণ হতে হতে মঙ্গলবার একেবারে সাদা হয়ে যাওয়ার এই দৃশ্য দেখে কৃষকের দিশেহারা হওয়া স্বাভাবিক। আলোচ্য প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে- ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের কমবেশি ৫০ হাজার হেক্টর ধানক্ষেত নষ্ট হয়েছে।

এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও কমবেশি এমন খবর আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সমকালের কাছে এ দুর্যোগকে 'মন্দ হাওয়া' হিসেবে বর্ণনা করলেও কৃষি বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে, 'হিট ইনজুরি' থেকেই ধানের পরাগায়ন ব্যাহত হয়েছে। এটা ঠিক, মৌসুমের এই সময়ে ধানের ক্ষেতে 'তাপাঘাত' ঘটতে পারে। কিন্তু এর আে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন চিত্র দেখা গেলেও এতটা ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হননি কৃষক। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ একে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত হিসেবে যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন, সেটিও উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। আমরা মনে করি, শুধু বৈজ্ঞানিক কারণ বিশ্নেষণ করেই কৃষি-সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে যেসব জমি এখনও অক্ষত রয়েছে, সেগুলোতে সব সময় পানি ধরে রাখতে যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সেটিও কৃষকরা প্রতিপালন করতে পারেন। কিন্তু এর কারণ ও প্রতিকার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এখনই শুরু করতে হবে। তবে সবকিছুর আগে দিশেহারা কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, বোরো মৌসুম শুধু কৃষকের জন্য ব্যক্তিগতভাবে প্রধান খাদ্য ও অর্থকরী অবলম্বন নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক খাদ্যশস্য উৎপাদনের বিষয়ও জড়িত।

এমনিতেই নানা কারণে কৃষি বিশেষত ধান উৎপাদন গত দুই বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে। এখন যদি নতুন বিপত্তি হিসেবে তাপাঘাত দেখা দিতে থাকে, তাহলে সবারই বিপদ। আমরা চাই, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হোক। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন পক্ষও এগিয়ে আসতে পারে। শুধু ত্রাণ নিয়ে নয়, ফসলের নতুন এই আপদ নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগ সরকারের পাশাপাশি সক্রিয় হোক। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষের মতামত ও পর্যবেক্ষণ পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিতে জরুরি। আর চিটা হয়ে যাওয়া ধানক্ষেতে তারা যাতে দ্রুততর সময়ে অন্য ফসল ফলাতে পারেন, সে ব্যাপারে কৃষি বিভাগ এখনই এগিয়ে আসুক। বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বোরো ধানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় খাদ্যশস্য মজুদে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে কিনা, তাও সময় থাকতে খতিয়ে দেখা জরুরি। আমরা জানি, এই তাপাঘাত ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বোরো ধানের ক্ষেত। দক্ষিণাঞ্চলে অস্বাভাবিক জোয়ারে তলিয়ে গেছে আরও কিছু ফসলের ক্ষেত। সব মিলিয়ে কৃষি উৎপাদনের ভবিষ্যৎ যে এই মৌসুমে আগের মতো মসৃণ নয়; বলাই বাহুল্য। সে ক্ষেত্রে সরকারের একটি 'কনটিনজেন্সি প্ল্যান' এখনই চূড়ান্ত করতে হবে। ভুলে যাওয়া চলবে না যে, করোনা পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়েই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে খাদ্যশস্যের মতো 'স্পর্শকাতর' পণ্য অর্থ থাকলেও স্বল্পসময়ের মধ্যে আমদানি করা যাবে না। কৃষি সংক্রান্ত যে কোনো দুর্যোগে তাৎক্ষণিক অথচ দূরদর্শী পদক্ষেপে যেমন কৃষক, তেমনি দেশের খাদ্যমজুদ পরিস্থিতি সুরক্ষিত থাকতে পারে। আমরা সেটিই দেখতে চাই।

মন্তব্য করুন