স্বীকার করতে হবে যে, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে 'লকডাউন' বা সর্বাত্মক সামাজিক দূরত্ব কোনো 'ধন্বন্তরি' নয়। আর বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় এর সর্বব্যাপ্ত বাস্তবায়নও সম্ভব নয়। কিন্তু বৈশ্বিক এই ভাইরাস যখন আমাদের ঘরের কোণে কোণে আগ্রাসন চালাতে থাকে; যখন আক্রান্ত ও মৃত্যের সংখ্যা নতুন নতুন 'রেকর্ড' সৃষ্টি করতে থাকে; তখন লকডাউনের চেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, চলতি বছরের গোড়ায় বাংলাদেশে সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা একক সংখ্যায় নেমে এলেও মার্চের শেষ দিকে আবার বাড়তে থাকে। গত এক সপ্তাহজুড়ে যখন মৃতের সংখ্যা শত ছুঁই ছুঁই করছে; তখন লকডাউন দেওয়ার বিকল্প আর কিছু ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু আরও উদ্বেগের বিষয়, সেই লকডাউন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ঢাকায় আক্রান্ত বিভিন্ন জনের নমুনায় দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা বেশি সংক্রমণশীল ও প্রাণঘাতী একটি করোনা 'স্ট্রেইন' ঢাকার মধ্যেই আবদ্ধ করার জন্য রাজধানীর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের অন্তত দুই সপ্তাহের বিচ্ছিন্নতা জরুরি ছিল। বাস্তবে দেখা গেছে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেওয়া সেই লকডাউন কার্যকর করা যায়নি। পহেলা বৈশাখ থেকে 'আরও কঠোর' যে লকডাউন দেওয়া হলো, তার আগেই ঢাকার প্রবেশ ও প্রস্থান পথগুলোতে জনতার বিপুল ভিড় আমরা লক্ষ্য করেছি।

কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম এই পরিস্থিতিতে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভিড়ের সঙ্গে যে তুলনা করেছে, তাতে অত্যুক্তি সামান্য। এমন আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, এভাবে ভিড় করে ঢাকা ছাড়ার মাধ্যমে জনাকীর্ণ পথে যেমন সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে, ঢাকার বাইরে বিস্তীর্ণ বাংলাদেশে তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বিশেষত মফস্বল এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে যে শৈথিল্য দেখা যায়, তাতে বিপদ আরও বাড়িয়েই দেওয়া হলো কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। রাজধানীর অভ্যন্তরেও লকডাউন প্রক্রিয়া নিয়ে দোদুল্যমান্যতা দেখা গেছে। প্রথম ব্যাংক বন্ধ থাকার ঘোষণা দেওয়ায় দুই দিন গ্রাহকরা ভিড় জমিয়ে ব্যাংকের কাজ সেরেছে। তারপর আবার বলা হয়েছে, ব্যাংক খোলা থাকবে সীমিত সময়ের জন্য। তাহলে প্রথম ঘোষণার প্রয়োজন কিছু ছিল? এর মধ্য দিয়ে কেবল সংক্রমণের ঝুঁকিই কি বাড়িয়ে তোলা হয়নি? কথিত কঠোর লকডাউনের প্রথম দিন থেকে 'চলাচল পাস' ইস্যু করার বিষয়টি উদ্ভাবনীমূলক ছিল, সন্দেহ নেই।

কিন্তু এতে একদিকে যেমন প্রয়োজন সত্ত্বেও অনেকে পাস পাননি, অন্যদিকে চিকিৎসক-নার্সের মতো প্রথম সারির যোদ্ধাদের অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র দেখানো সত্ত্বেও হয়রানি ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। তার মানে, লকডাউনে কারা চলাচলের সুযোগ পাবেন, সে সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে স্পষ্ট বার্তা ছিল না। অথচ আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, গত বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবারের লকডাউন হবে আরও সুশৃঙ্খল। বাস্তবে গত বছরের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আমরা প্রত্যাশা করি, বিলম্বে হলেও লকডাউন বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্তরা এসব ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক হবেন। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে- দায় যার যার, দায়িত্ব সবার। বিপুল জনংখ্যার এই দেশে কেবল আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিয়ে লকডাউনের মতো ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতার বিকল্প নেই। প্রথম দিন যেভাবে কিছু মানুষ 'লকডাউন দেখতে' পথে বের হয়েছিল, তা আত্মঘাতেরই নামান্তর।

আমরা চাই, সবাই দায়িত্বশীল হবেন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হবেন না। ভুলে যাওয়া চলবে না, সাময়িক এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক কল্যাণের স্বার্থেই গৃহীত হয়েছে। আমরা যত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারব, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ স্তিমিত করা তত সহজ হবে। আর তত তাড়াতাড়ি আমরা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারব। লকডাউনের মতো ব্যবস্থা জীবিকার জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং আমরা জানি। কিন্তু এটাও জানতে হবে, জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। জীবন বাঁচাতে জীবিকায় সাময়িক যতি তাই মেনে নিতেই হবে।

মন্তব্য করুন