রমজানে বাজার বেজায় গরম- আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত বাক্য। আমরা কয়েকদিন আগে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই সতর্ক করে দিয়েছিলাম, রমজানে বাজারে যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা 'কারসাজি' চালাতে না পারে- এ জন্য সরকারের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলের তদারকি-নজরদারি বাড়াতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে অবস্থা যে পূর্ববৎই রয়ে গেছে- এর সাক্ষ্য মিলেছে শুক্রবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। আমরা জানি, করোনা মহামারির সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে 'সর্বাত্মক লকডাউন' চলছে। কিন্তু সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর নয়। তারপরও অসাধুরা 'লকডাউন'কেই ইস্যু করে কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ভোগ্যপণ্যেরই দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। রমজানে সাধারণত যেসব পণ্যের বাড়তি চাহিদা সৃষ্টি হয়, সেসব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। শসা, টমেটো, লেবুসহ অন্য কাঁচা পণ্যের সরবরাহে কোনো ঘাটতি না থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা 'ঝোপ বুঝে কোপ মারা'র সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের পকেট স্ম্ফীত করছেন। অস্বাভাবিক এই দাম বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ না দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা 'লকডাউন অজুহাত' দাঁড় করিয়েছেন।

দেখা গেছে, উৎপাদনের উৎসের সঙ্গে বাজারের দামের মধ্যে বিস্তর ফারাক। আমরা এও দেখেছি, যেসব এলাকায় কৃষিপণ্য বেশি উৎপাদিত হয়, সেসব এলাকায় মধ্যস্বত্বভোগীদের শ্যেন দৃষ্টি পড়ে। লাভের গুড় খায় পিঁপড়ায়। মাঝখানে কৃষকের মেরুদণ্ড ভাঙে, ভোক্তারা পড়েন মূল্যস্ম্ফীতির চাপে। মাছ-মাংসের দাম বেশি থাকায় ভোক্তার দৃষ্টি সবজির দিকে। কিন্তু প্রায় সব সবজির দামই ঊর্ধ্বমুখী। তাছাড়া ছোলা, ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, খেজুর ইত্যাদি পণ্যও সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে অনেক বেশি দাম দিয়ে ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে। নিকট অতীতে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, সব ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও রমজানের আগেই নিত্যপণ্যের দাম আরেক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে অসাধু চক্র। রমজানে বাড়তি চাহিদার সঙ্গে দাম যাতে না বাড়ে, সে জন্য সরকারের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো দৃশ্যত যেসব ব্যবস্থা নিয়ে থাকে, সেসব ব্যবস্থা বাজার নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে না, আমাদের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। এটা স্পষ্ট যে, করোনা-দুর্যোগে অনেকের আয়-রোজগার কমে গেছে, অনেকেই হয়েছেন কর্মহীন। অথচ ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, করোনা-দুর্যোগে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এর পাশাপাশি বেড়েছে আমদানিও। বাজারে নিত্যপণ্যের কোনো ঘাটতি নেই। সবজি সরবরাহেও কোনো কমতি নেই।

তারপরও বাজারে তুঘলকি কাণ্ড কেন? এরকম কি চলতেই থাকবে? আমরা কিছুদিন আগে এই স্তম্ভেই এও বলেছিলাম, সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবিকে শক্তিশালী করে 'ট্রাক সেল' বা ডিলারের মাধ্যমে নিত্যপণ্য বিক্রির পরিসর বাড়ানো হোক। কিন্তু এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত চিত্র দৃশ্যমান নয়। টিসিবি যে কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা যেন সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর মতো। করোনা পরিস্থিতিতে বাজার ব্যবস্থার অস্থিতিশীলতা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার শামিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমজানের আগেই আমরা যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে। 'সিন্ডিকেট' শব্দটি আমাদের দেশে বাজারের ক্ষেত্রে বহুল পরিচিত। প্রশ্ন হচ্ছে, এই 'সিন্ডিকেট'-এর কারসাজির শিকার সাধারণ মানুষ আর কত হবে। 'সিন্ডিকেট' ভাঙতেই হবে।

তাদের সংহত হওয়ার পথও রুদ্ধ করতে হবে। বাজারে নজরদারি-তদারকি কঠোর করার পাশাপাশি অতি মুনাফার অপচেষ্টা যারাই করুক না কেন, তাদের প্রতি কোনো অনুকম্পা না দেখিয়ে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে কঠোর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমদানিকৃত ও দেশজ উৎপাদিত দুই ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেরই সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন ও নির্বিঘ্ন রাখার ব্যাবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ী চক্র যাতে ক্ষমতা-সংশ্নিষ্ট কারোর সঙ্গে নিবিড়-নিগূঢ় সম্পর্ক গড়তে না পারে এ ব্যাপারেও সরকারের শ্যেন দৃষ্টি জরুরি। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী কিংবা অতি মুনাফাখোরের কারণে ভোক্তারা নাকাল হবেন আর এর স্থায়ী সমাধানে দায়িত্বশীলদের দায়িত্ব শুধু অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ থাকবে- তা হতে পারে না। আমরা দেখতে চাইব, সংশ্নিষ্ট সব পক্ষ বাজার নিয়ন্ত্রণে করণীয় সবকিছু নিশ্চিত করতে সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।

মন্তব্য করুন