রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবিত ও মৃত' গল্পে আমরা দেখেছি- কাদম্বিনী মরে গিয়ে প্রমাণ করে যে, সে আসলে মরে নাই। আর যশোরের বজলুর রহমান নির্বাচন কমিশনের অফিসে গিয়ে প্রমাণ করেন যে, তিনি আসলে জীবিত। জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যে কত ধরনের তুঘলকি কাণ্ড ঘটে চলেছে, যশোরের ঘটনা তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। সোমবারের সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, কেবল বজলুর রহমানই নয় যশোরে নির্বাচন অফিসের ভুলে সার্ভারে জীবিত অনেক ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হচ্ছে। এমনকি গত তিন মাসে সেখানে বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ২০ জন এমন সমস্যা নিয়ে ধরনা দিচ্ছেন নির্বাচন অফিসে। আমরা মনে করি, জীবিত নাগরিককে মৃত দেখানো সাধারণ কোনো সমস্যা নয়। বিশেষ করে, যে সনদে নাগরিকের সার্বিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হয় সেখানে এ ধরনের বিভ্রান্তি গুরুতর অপরাধ। দিব্যি একজন মানুষ কীভাবে 'মৃত' হয়ে গেল তার কোনো সদুত্তরও নেই। সমকালের প্রতিবেদকের কাছে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, পরিবারের সদস্য বা জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যে ভুল থাকার কারণে এমনটি হতে পারে। তার এ দাবি কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? পরিবারের কোনো সদস্য আরেকজনের ব্যাপারে এমন ভুল তথ্য দেওয়ার কথা নয়। আর একজন জনপ্রতিনিধি এমন তথ্য দিলেও কর্মকর্তাদের উচিত ছিল, তা যাচাই করা। একজন জীবিত পরিচয়পত্রধারীকে এত সহজে মৃত বানিয়ে দেওয়া যায়? বস্তুত আমরা মনে করি, গরমিলটা অন্য কোথাও হয়েছে। একই জেলায় একসঙ্গে এতজনের 'মৃত' বানানোর বিষয়টি কাকতাল হতে পারে না। এ জন্য তদন্ত করে বিষয়টি খতিয়ে দেখতেই হবে। সমকালের প্রতিবেদনে তিনজনের ব্যাপারে বিস্তারিত এসেছে, নির্বাচন কমিশনের এই ভুলের মাশুল তাদের দিতে হচ্ছে। বজলুর রহমান এ বছর শেষে অবসরে যাবেন। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার তথা ইএফটির আওতায় বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হবে বলে জাতীয় পরিচয়পত্র সঠিক না থাকলে তিনি সমস্যায় পড়বেন।

আবদুল জলিল ও হাফিজুর রহমান জাতীয় পরিচয়পত্রের অভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তারা বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটাধিকারও প্রয়োগ করতে পারেননি। এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রের অভাবে এরা চলমান করোনা প্রতিরোধে টিকাও দিতে পারেননি। আমরা জানি, রাষ্ট্রীয় প্রায় সব প্রয়োজনে জাতীয় পরিচয়পত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় পরিচয়পত্রে কাউকে মৃত দেখানোর মানে একদিকে তিনি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রীয় সব হিসাব-নিকাশের বাইরে। জীবিত নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্রে মৃত হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও অন্যান্য জেলায় এ ধরনের ঘটনায় অনেকে ভোগান্তিতে পড়েছেন। কেন এমন গরমিল ঘটছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে কেন্দ্রীয়ভাবেই। জাতীয় পরিচয়পত্র একটি কারিগরি বিষয় হলেও এটি তৈরি, সংশোধন কিংবা যাচাইয়ে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে তাতে বিষয়টিকে কেবল কারিগরি ত্রুটি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বস্তুত আমরা দেখেছি, জাতীয় পরিচয়পত্রের জালিয়াতিতে একটি দল সক্রিয় রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের অসাধু কর্মচারীদের যোগসাজশেই জালিয়াতি হয়েছে বলে প্রমাণও রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদেরও জালিয়াতির মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র। এ ক্ষেত্রে সামান্য অর্থের লোভে সংশ্নিষ্টরা জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে দ্বিধা করেনি। এসব বিবেচনায় যশোরের ঘটনাটিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। আমরা দেখতে চাই, এ ব্যাপারে অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। কারও কারসাজি বা ঔদাসীন্যের কারণে এমন ঘটনা ঘটলে, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় আমাদের আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ার আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না। জীবিত মানুষকে যখন মৃত দেখানো হচ্ছে, তখন এই প্রশ্নও সঙ্গত যে, মৃত ব্যক্তিদেরও 'জীবিত' দেখানো হচ্ছে কিনা? যারা মারা যান, তাদের তথ্য কি হালনাগাদ করা হয়? বিভিন্ন সময় মৃত ব্যক্তি এসে ভোট দিয়ে যাওয়ার যেসব ঘটনা আমরা শুনে থাকি, তার ফাঁক জাতীয় পরিচয়পত্রেই রয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

মন্তব্য করুন