করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান 'লকডাউন' ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। আমরা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এমন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করি না। তবে অতীতে আমরা দেখেছি, এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই সংকটে পড়েন; বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপন দুরূহ হয়ে পড়ে। মঙ্গলবার সমকালের 'নিম্ন আয়ের মানুষ বড় দুর্দিনে' শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, যারা একেবারেই দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল তাদের অবস্থা শোচনীয়। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর 'ঈদ উপহার' আড়াই হাজার টাকা করে সোয়া ৩৬ লাখ পরিবারকে দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। গতবারও তারা এই সহায়তা পেয়েছিলেন। এবার এই তালিকার বাইরে থাকা দরিদ্রদের নগদ সহায়তা দিতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এই বাজারে আড়াই হাজার টাকা বড় অঙ্ক না হলেও তাতে খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকা নির্বাহে কিছুটা হলেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে চলমান লকডাউনে ১ কোটি ২৫ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। আমরা সরকারের এসব উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি এও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, চলমান দুর্যোগ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীর সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। গতবার সরকারের পাশাপাশি সমাজে বিত্তবান, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থা এগিয়ে এলেও এবার তেমনটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অথচ পরিস্থিতি বিবেচনায় গতবারের চেয়ে মানুষের আর্থিক অবস্থা এবার আরও খারাপ। আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতিতে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানামুখী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সামাজিক সুরক্ষার পরিসর বাড়ানো জরুরি। সমাজের বিত্তবান শ্রেণির পাশাপাশি শিল্পপতিদেরও এগিয়ে আসা উচিত। লকডাউন-পরবর্তী সময়ে মানুষ যাতে সহজে কর্মে যুক্ত হতে পারে, সে রকম পরিবেশও নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের দুর্যোগে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি থাকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। তারা না পারে উপার্জন করতে, না পারে হাত পাততে। তাদের জন্য স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। দরিদ্রদের সহায়তার জন্য সরকারের যেসব কর্মসূচি রয়েছে, দ্রুত সেসবের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সবাইকে এই অঙ্গীকারে নিষ্ঠ থাকতে হবে- সরকারি সহায়তা নিয়ে কেউ যাতে নয়ছয় না করতে পারে। সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে দরিদ্র-দুস্থ কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষদের নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরগুলো তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে এই বিতরণ সেবা বিনামূল্যে দিতে পারে। এর ফলে অনিয়ম-দুর্নীতির ঝুঁকি যেমন কমবে, তেমনি স্তরে স্তরে ভোগান্তির লাঘব হবে। যদি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে লকডাউনের সুফল মিলবে না। ক্ষুদ্র, মাঝারি ব্যবসায়ীসহ বস্তিবাসী, চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা ও প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তাদের একটা বড় অংশ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা সহায়তার বাইরে থেকে যায়। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, সমতলে কিংবা পাহাড়ে প্রান্তিক কিংবা মূলধারার অনেক দরিদ্র গতবার সরকারের সহায়তা পাননি। সহায়তা বণ্টনের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে বৈষম্য দূর করতে হবে। সরকারের সহায়তা কিংবা প্রণোদনা পরিকল্পনার কার্যকর ও স্বচ্ছ উদ্যোগই বিপন্নদের দুর্যোগ থেকে বহুলাংশে পরিত্রাণ দিতে পারে।

মন্তব্য করুন