দেশের প্রধান খাদ্যশস্য চালের বাজারে দীর্ঘমেয়াদে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে- সরকারি গুদামে চালের সামান্য মজুদ, সেখানে পানি না ঢেলে, ঘি ঢালার নামান্তর। শুক্রবারের সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ, 'অস্থিরতা বাড়তে পারে চালের বাজারে'। বারবার প্রশাসনের আশ্বাসের পরও গত এক বছরে চালের বাজার যেভাবে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে, তাতে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের সংগ্রহ নীতিমালা অনুযায়ী গুদামে সব সময় কমপক্ষে দশ লাখ টন চাল মজুদ থাকার কথা থাকলেও এখন সরকারের কাছে মজুদ আছে তিন লাখ টনের কম। আমরা জানি, সরকার আমদানির মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। হিসাব বলছে, সরকারি-বেসরকারিভাবে আমদানির লক্ষ্য ঠিক করা হলেও বাজারে চাল এসেছে অর্ধেকেরও কম। এটা স্পষ্ট, বিশাল এই ঘাটতিই চালের বাজারে অস্থিরতা বাড়ার শঙ্কা তৈরি করেছে। আমাদের মনে আছে, আমদানির খবরে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যায়ে সব ধরনের চালের দাম এক-দুই টাকা করে কমতে শুরু করলেও আমদানি ও সরবরাহের ধীরগতি এবং উল্টো আমদানি করা কয়েক প্রকারের মোটা চালের দাম বাড়তি থাকায় ওই ধরনের দেশীয় চালের দাম আরও বাড়ে। বস্তুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই আমদানির মাধ্যমে চালের ঘাটতি পূরণের সরকারি উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, সীমান্তে ট্রাকে ও কাস্টমসে হয়রানির কারণে অনেকে এলসি খোলার পরও চাল দেশে আনতে পারেননি। আমরা দেখছি, আমদানির ব্যর্থতা এবং চালের পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় নতুন ধান উৎপাদন হওয়ার পরও চালের দাম কমেনি বরং দিন দিন দাম বেড়েই চলেছে। চালের বাজারে অস্থিরতার কারণে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারের ওপর আর্থিক বাড়তি চাপ পড়ে।

সেদিকে সরকারের নজর কতটা রয়েছে আমরা জানি না। এটা দুর্ভাগ্য যে, করোনাদুর্যোগের পুরোটা সময় ধরে চালের বাজার অস্থির। সংকটের এ সময়ে যখন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবারের আয় কমে গেছে, যখন পরিবারের কর্মক্ষম অনেকের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, ঠিক এ সময়ে মাছে-ভাতে বেঁচে থাকা বাঙালিকে ভাত নিয়েই চিন্তা করতে হচ্ছে! সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, গত এক বছরে দেশের খুচরা বাজারে চালের দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। সরকার অন্তত চালের বাজার ঠিক করে কম দামে দেওয়ার ব্যবস্থাপনা করতে পারলেও অনেক পরিবারে স্বস্তি আসত। কিন্তু মজুদ বাড়াতে না পারলে অধরা বাজার যে আরও লাগামহীন হয়ে পড়ে, তা বলাই বাহুল্য। আমরা মনে করি, বাজারে প্রভাব রাখতে হলে বেসরকারি উৎসে নির্ভরশীল না হয়ে সরকারকেই আমদানি করতে হবে। বাস্তবে এবার সরকার নিজে যে পরিমাণ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটিও আনতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিষ্টদের জবাবদিহি করা উচিত। সরকারকে এখন যেভাবেই হোক দেশের কৃষক ও মিল মালিকদের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতেই হবে।

বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছেন, চলতি বোরো মৌসুমে কোনো কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে চালের বাজারে আরও ঊর্ধ্বগতি দেখা দেবে। মনে রাখতে হবে, সরকার গত বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। একইভাবে আমন মৌসুমেও সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। অতীতে লক্ষ্যমাত্রা কেন পূরণ হয়নি, এ থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার ধান-চাল সংগ্রহে নামতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দুই কোটি ৫ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। খাদ্য সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ধান-চাল সংগ্রহে যে গুরুত্ব দিয়েছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা চাই, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসন সম্ভাব্য সকল ব্যবস্থা জোরালোভাবে নেওয়া হোক। কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা মিলকল মালিকরা যেন কোনো ধরনের কারসাজি করতে না পারে, সে জন্য আগাম নির্দেশনাও সরকারকে দিয়ে রাখতে হবে।

মন্তব্য করুন