চলমান দুর্যোগের মধ্যেই করোনাভাইরাসের দ্রুত সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতাসম্পন্ন ভারতীয় ধরন বাংলাদেশেও শনাক্ত হওয়ার খবরটি উদ্বেগজনক। সোমবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, ওই ধরনটি শনিবার কয়েকজনের শরীরে শনাক্ত হওয়ার পর রোববারও ভারতফেরত আরও ১৪ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় ধরন শনাক্ত হওয়ার পর দেশে নতুন করে আতঙ্ক বাড়ছে। আমরা জানি, প্রতিবেশী দেশটির অবস্থা এখন কতটা নাজুক। ভারতে সাম্প্রতিক হিসেবে দৈনিক প্রায় চার লাখ আক্রান্ত হওয়া এবং দৈনিক প্রায় চার হাজার মৃত্যুবরণ করার মানে সেখানে ভাইরাসটি কতটা নিয়ন্ত্রণহীন। ভারতে এমন ভয়াবহ রূপ ধারণ করার কারণ সেখানকার ভাইরাসটির বিশেষ ধরন। যেটি কোনোভাবে দেশে প্রবেশ করলে আমাদের অবস্থাও ভারতের মতো ভয়ংকর হতে পারে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সতর্ক থাকার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সেখানেই। প্রথমত ভারত থেকে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিস্থিতি খরাপ হলে আমাদের প্রস্তুতিও আগে থেকেই নিতে হবে।

আমরা দেখেছি, অবস্থার আলোকে সরকার বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে সীমান্ত যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে। তবে পণ্য পরিবহন চলছে এবং যারা এরই মধ্যে চিকিৎসার জন্য গিয়ে আটকা পড়েছেন বা ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে; তারা বেনাপোল, আখাউড়া ও বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে দেশে ফিরতে পারছেন। নিয়ম অনুযায়ী ভারতফেরতদের ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে যে তিন স্থলবন্দর দিয়ে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন, সেখানে কোয়ারেন্টাইন সুবিধা শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে নতুন করে কাউকে কোয়ারেন্টাইন করতে স্থানীয় প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। যদিও সেখান থেকে পাশের জেলাতেও কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হচ্ছে। তবে সঠিকভাবে কোয়ারেন্টাইন শেষ না করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এ বিষয়টিতে অবশ্যই নজর দিতে হবে। অনেক সময় আকাশ ও স্থলপথ গুরুত্ব পেলেও নৌপথে তেমন মনোযোগ দেওয়া হয় না। তাই ভারতের সঙ্গে নৌপথেও কড়াকড়ি আরোপ করা প্রয়োজন। সতর্কতার মধ্যেও ভারতীয় ধরন নিয়ে অনেকে দেশে ঢুকে পড়তে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া চাই। বস্তুত গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে সর্বাধিক মৃত্যু ও সর্বাধিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

ওই সময় দেখা গেছে একদিকে আইসিউতে সীমিত শয্যা, অন্যদিকে হাসপাতালে আসন সংকট, যথাযথ সেবা ও দক্ষ চিকিৎসকের অভাব, অব্যবস্থাপনা-অনিয়ম ইত্যাদি সমস্যার কারণে অনেকেই যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। রাজধানীর এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতাল ঘুরেও ভর্তি হতে না পেরে অ্যাম্বুলেন্সেই রোগী মারা যাওয়ার মতো অমানবিক পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়। আমরা দেখছি এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে দেশে করোনা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। গত কয়েকদিনের করোনা পরিসংখ্যান যে আশা জাগাচ্ছিল, ভারতীয় ধরন শনাক্তের খবর সেখানে হতাশা সৃষ্টি করেছে। তার সঙ্গে ঈদে গ্রামমুখো জনস্রোত শঙ্কার পারদ আরও ওপরে তুলে দিচ্ছে।

আমরা এ সম্পাদকীয় স্তম্ভে গতকালই লিখেছি, ঈদ করতে গিয়ে আমরা যেন স্বজনদের ঝুঁকির কারণ না হই। ঘাটে ঘাটে মানুষের ভিড় এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলে বাড়ি ফেরার বহুবিধ ঝুঁকি এড়াতে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতেই হবে। তা না হলে এর মাধ্যমে ভারতীয় ধরনের সংক্রমণও বাড়ার শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তেমনটা হলে আমাদের ঢিলেঢালা লকডাউন আর অপ্রতুল স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। বলাবাহুল্য, করোনার ভারতীয় ধরন বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়ার পর অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য সব সতর্কতা বজায় রাখা চাই। কোনোভাবেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে নূ্যনতম শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই। ব্যক্তিগত পর্যায়ে মাস্ক ব্যবহারসহ শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি সবাইকেই এ দুর্যোগ চলাকালে দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখতে হবে। ঈদের পর বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি খারাপের যে ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তা মাথায় রেখে সরকারকে ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত করাসহ, স্বাস্থ্য সেবা বাড়ানোর সম্ভাব্য সব প্রস্তুতি রাখা চাই।

মন্তব্য করুন