করোনা মহামারিতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের করুণ চিত্রই স্পষ্ট শুধু হয়নি, একই সঙ্গে এ খাত-সংশ্নিষ্ট অনিয়মও সামনে এসেছে আরও আগেই। ভয়াবহ দুর্যোগকেও অনেকে কীভাবে পৌষ মাস বানিয়েছে তার উদাহরণ ভুয়া করোনা সনদ। গত বছরের মাঝামাঝি দেশে যখন প্রথম ভুয়া সনদের বিষয়টি ধরা পড়ে, তখনই আমরা দেখেছি তা যতটা না দেশে আলোচিত হয়েছে, তার চেয়েও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে বিদেশে। বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রে তখন ছাপা হয় দেশের কেলেঙ্কারির কথা। এমনকি ওই ঘটনার পর কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তখনই বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছিলেন, এজন্য বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে মূল্য দিতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রায় এক বছর পর মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমরা জানলাম ভুয়া করোনা সনদের কারণে 'খেসারত দিচ্ছেন বিদেশে বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরা'। প্রতিবেদনে দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ কয়েকটি দেশের চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বৃত্তি তথা স্কলারশিপ পাওয়ার পরও যেতে পারছেন না। যারা আংশিক বৃত্তি পেয়েছেন কিংবা পুরো টিউশন ফি দিয়ে ভর্তি হয়েছেন, তারা গত এক বছরে অর্থ খরচ করেও বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু করতে যেতে পারছেন না। ভর্তির পর এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও যারা এখনও যেতে পারেননি, তারা আশঙ্কা করছেন তাদের ভর্তি বাতিল হতে পারে। আমরা জানি, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি লাভ করা কতটা কঠিন এবং সেই বৃত্তি শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হলো, এসব শিক্ষার্থীর ক্ষতির দায় কে নেবে। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দায় এড়াতে পারে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত ছিল যথাযথ পরিদর্শন করে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষার প্রস্তুতি ও সার্বিক সক্ষমতা যাচাই করার পর তাদের পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়া। একই সঙ্গে অনুমোদন দেওয়ার পর হাসপাতালগুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা করে সঠিক রিপোর্ট দিচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি ছিল। বাস্তবে তারা তা করেনি। এমনকি আমরা জেনেছি, ভুয়া করোনা সনদের জন্য বহুল আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের লাইসেন্স বা চিকিৎসা প্রদানের ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল ২০১৪ সালে। নবায়ন ছাড়াই তারা ছয় বছর ধরে চিকিৎসা 'সেবা' দিলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। উপরন্তু করোনা পরীক্ষা করার অনুমতি দিয়েছিল! সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলোতে প্রকাশ- তারা পরীক্ষা দূরে থাক, করোনা সন্দেহভাজনদের নমুনা সংগ্রহ করে ফেলে দিয়ে মনগড়া রিপোর্ট দিত। ওই ঘটনার জের এখনও বাংলাদেশকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এর প্রভাবে বিদেশে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা এখন খেসারত দিচ্ছেন। আমরা বিস্মিত, ভুয়া করোনা সনদের কারবার এখনও চলছে! বিদেশগামী যাত্রীদের অনেকে দালালের খপ্পরে পড়ে ভুয়া করোনা সনদ সংগ্রহ করছেন। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিদেশগামীদের করোনা সনদ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বেসরকারি চারটি ল্যাব বন্ধ করে কয়েক দফা নির্দেশনা জারি করেছে। এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড জনস্বাস্থ্যের জন্যই হুমকি নয় বরং দেশের ভাবমূর্তি ভয়ংকররূপে ক্ষুণ্ণেরও কারণ। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা যথাযথভাবে মানতে প্রশাসনিক তৎপরতার বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীসহ ইতোমধ্যে যারা স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হয়েছেন, তাদের সংশ্নিষ্ট দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তৎপর হতে হবে। বিদেশে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা যেন ক্ষতির শিকার না হন, সেজন্য সংশ্নিষ্ট দেশ ও দূতাবাসের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করা জরুরি। সমকালের প্রতিবেদনে জানা গেছে, লকডাউনের কারণে ঢাকার জার্মানি দূতাবাস ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখে। পরে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের পর ভিসা সাক্ষাৎকার শুরু হলেও এ কার্যক্রমের গতি মন্থর। ভিসা কার্যক্রম দ্রুত করতে প্রশাসনিক তৎপরতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন্ধ রাখা ভিসা কার্যক্রম খুলতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও আলোচনা দরকার সার্বিক স্বার্থেই। শুধু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্যই নয়, দেশের সামগ্রিক স্বার্থেই শিক্ষার্থীদের সংশ্নিষ্ট দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

বিষয় : করোনা সনদ

মন্তব্য করুন