করোনা পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি প্রথম শ্রবণে 'স্বাভাবিক' মনে হতে পারে। বাংলাদেশ কেবল নয়, গোটা বিশ্বেই যেখানে কমবেশি অর্থনৈতিক মন্দা ও স্থবিরতা চলছে, সেখানে ঋণ আদায়েও এর বিরূপ প্রভাব অস্বাভাবিক হতে পারে না। কিন্তু যে বিষয়টি উদ্বেগের, তা হলো খেলাপি ঋণের এই স্ম্ফীতি দেখা যাচ্ছে ঋণ পরিশোধে নানা সুবিধা ও নিয়ম শিথিলতা সত্ত্বেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য দিয়ে বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি বেড়ে কমবেশি ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আমরা জানি, করোনা পরিস্থিতি মাথায় রেখেই গত বছর খেলাপি ঋণ ঘোষণায় অনেকটা ঢালাও ছাড় দেওয়া হয়েছিল। এ বছর কিছুটা লাগাম টেনে ধরা সত্ত্বেও গ্রাহকদের প্রাপ্ত সুবিধা কম নয়।

আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- যেসব মেয়াদি ঋণ চলতি বছরের মার্চের মধ্যে পরিশোধ করার কথা, ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে তা আগামী বছরের জুনে পরিশোধ করলেও চলবে। আর চলমান ঋণের ওপর ২০২০ সালে আরোপিত অনাদায়ী সুদ একবারে পরিশোধ না করে আগামী জুন পর্যন্ত ছয়টি কিস্তিতে পরিশোধ করা যাবে। এ ছাড়া তলবি ঋণ চলতি বছরের মার্চ থেকে আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আটটি কিস্তিতে পরিশোধ করা যাবে। বস্তুত, এর চেয়ে 'উদারতা' আর কী হতে পারে? তারপরও কেন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার বাড়ছে, এর জবাব পাওয়া যায় রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্যে। সমকালের কাছে তিনি বলেছেন- 'যাদের সামর্থ্য আছে তাদের মধ্যেও অনেকে ঋণ পরিশোধ করছে না।' তার এই আশঙ্কার সঙ্গে আমরা একমত যে- ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শিথিলতা উঠে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আমরা চাই, ভবিষ্যতের সেই খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি এখন থেকেই নেওয়া হোক। এক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ আদায়ে কর্তৃপক্ষের জোরালো উদ্যোগের বিকল্প নেই। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখছি, মাঝেমধ্যে ঋণ খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করেই দায় সারে সরকার।

জাতীয় সংসদে বা সংসদের বাইরে এ ধরনের তালিকা প্রকাশের ফলে ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর 'সমাজিক চাপ' সৃষ্টি নয়, অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু যেভাবে বছরের পর বছর ধারাবাহিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার বেড়ে চলছে, তাতে কেবল সামাজিক চাপের ভরসায় বসে থাকার অবকাশ নেই। মনে রাখতে হবে, খেলাপি ঋণ কেবল সংশ্নিষ্ট ব্যাংকের জন্য বোঝা নয়; অন্য উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগও সীমিত করে দেয়। অস্বীকার করা যাবে না, নানা কারণেই ঋণ খেলাপি হতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন দেশে এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে ঋণ গ্রহীতা নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে খেলাপি পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের নজির দেখা যায় না। খেলাপিরাই বরং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা চাপ সৃষ্টি করে থাকেন। এও স্বীকার করতে হবে, খেলাপি ঋণের রাজনৈতিক রং থাকে। কিন্তু এর ফলে দেশের অর্থনীতির রং যে বিবর্ণ হয়, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।

সামষ্টিক অর্থের অব্যবস্থাপনায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের এই গদাইলস্করি চাল আর চলতে দেওয়া যায় না। করোনা পরিস্থিতি আমরা উপেক্ষা করতে বলি না। এই পরিস্থিতিতেও অর্থনীতি সচল রাখতে বিনিয়োগ ও ঋণ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য সব ধরনের ছাড় দিতেই হবে। কিন্তু খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ যে আসলে নিছক সুশাসন ও সদিচ্ছার অভাব থেকে জমে, ভুলে যাওয়া চলবে না। আমরা মনে করি, যে কোনো মূল্যেই খেলাপি ঋণের হার ও ঋণখেলাপির সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। সে ক্ষেত্রে সাবেক ঋণ আদায়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতেও যাতে কেউ 'ইচ্ছাকৃত' খেলাপি হতে না পারে, সেদিকে দিতে হবে বিশেষ নজর। খেলাপি ঋণ, এর বিরূপ প্রভাব, সম্ভাব্য করণীয় নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে; এখন আমরা কাজ দেখতে চাই।

বিষয় : ব্যাংক খাত

মন্তব্য করুন