জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম শাহজাদা যেভাবে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন, তা অভিনব সন্দেহ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনসভায় 'দৃষ্টি আকর্ষণ' করতে এ ধরনের 'প্রদর্শনী' প্রায়শই দেখা গেলেও বাংলাদেশে বিরলই বটে। কিন্তু পদ্ধতিটি যে কার্যকর, তা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত। আর কোনো দাবি নাই, ত্রাণ চাই না, বাঁধ চাই- এমন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড গলায় ঝুলিয়ে বুধবার আলোচ্য সংসদ সদস্যের বক্তৃতার ওই স্থির ও চলচ্চিত্র ইতোমধ্যে 'ভাইরাল' হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ছবির পাশাপাশি দাবিটি নিয়েও দেখা গেছে গুরুত্ববহ আলোচনা। সমকালে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, পটুয়াখালীর এই সংসদ সদস্য দাবিটি তুলে তার নির্বাচনী এলাকায় উচ্চ প্রশংসা লাভ করেছেন।

বস্তুত, বাঁধের দাবিটি নিছক দৃষ্টি আকর্ষণের বিষয় নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িত লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন। সমকালের প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে- তার নির্বাচনী এলাকা দশমিনা উপজেলার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নেই চর বোরহান ইউনিয়ন, চরশাহজালাল, চরহাদী, চর বাঁশবাড়িয়া, চর ফাতেমা, চর লালচর ও চর আজমাইনের। এসব এলাকায় অর্ধলাখের বেশি মানুষ বসবাস করলেও তাদের সুরক্ষায় বেড়িবাঁধ নেই। এ কারণে প্রতিবছর ঘটে ফসলহানি। আমাদের মনে আছে, বাঁধ নিয়ে ঔদাসীন্যের দায়ে সাতক্ষীরার একজন সংসদ সদস্যকে সম্প্রতি 'তাড়া খেতে' হয়েছে। যখন স্থানীয় জনসাধারণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বিধ্বস্ত বাঁধ পুনর্নির্মাণ করছিল, তখন সেখানে গিয়ে চরম বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছিলেন তিনি। সেদিক থেকে পটুয়াখালীর সংসদ সদস্য এস এম শাহজাদা তার নির্বাচনী এলাকার বাইরে থেকেও সাধুবাদ পেতে পারেন।

আমরা প্রত্যাশা করি, সংসদেও তার এই বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ বাজেট ও বরাদ্দের নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ লাভ করবে। লক্ষণীয়, এবার বাজেটের শিরোনাম 'জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ'। সে ক্ষেত্রে নিজের নির্বাচনী এলাকার জীবন ও জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ ব্যবস্থা নিয়ে সংসদ সদস্যের এই দৃষ্টি আকর্ষণী উদ্যোগ বৃথা যাওয়া উচিত হবে না। আমরা দেখেছি, বেড়িবাঁধের মতো স্থাপনা নির্মাণ ও সংস্কারে প্রধান দায়িত্ব যে মন্ত্রণালয়ের, সেই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ এবার গত অর্থবছরের তুলনায় কমেছে। বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের এমন জনগুরুত্বপূর্ণ দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তা বাড়ানো বা অন্তত গত বছরের মতো রাখার কথা অর্থমন্ত্রী ভাবতে পারেন। আলোচ্য সংসদ সদস্যকেও ভাবতে হবে যে, বরাদ্দের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। প্রতিবছরই উপকূলীয় বাঁধের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, বাস্তবায়ন পর্যায়ে তার সদ্ব্যবহার হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

জীবন ও জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ অর্থ যাতে সদ্ব্যবহার হয়, সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে তা নিয়ে সোচ্চার হতে পারেন না? এ ব্যাপারে অবশ্য সন্দেহ নেই যে, ষাটের দশকে নির্মিত বাঁধগুলো যেমন সংস্কার করতে হবে, তেমনই নতুন নতুন এলাকাকে আনতে হবে বাঁধের আওতায়। সম্প্রতি বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের সময় আমরা দেখেছি- বাংলাদেশে এটি আঘাত না হানলেও এর প্রভাবে বাঁধ ভেঙে ও উপচে প্রবেশ করা নোনাপানি উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। আমরা জানি, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশে সক্ষমতা এখন বৈশ্বিক উদাহরণ। আমাদের দেশে নব্বই দশকে প্রণীত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ একটি কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে ইতোমধ্যেই প্রমাণিত। যে কারণে নব্বইয়ের দশকের পর ক্রমেই কমতে থাকে প্রাণহানি। ঘূর্ণিঝড় থেকে সুরক্ষায় স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে নকশা করার উদ্যোগও যথেষ্ট উদ্ভাবনীমূলক। এখন নজর দিতে হবে বাঁধ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী ও সংহত করার দিকে। মাঠপর্যায়ে নজরদারি ও সুশাসন ছাড়া কেবল বরাদ্দ দিয়ে তা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রেও যদি সংসদ সদস্যরা উদ্যোগী ও সক্রিয় হন, তাহলে ইতিবাচক পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব।

বিষয় : সাংসদের গলায় প্ল্যাকার্ড প্ল্যাকার্ড

মন্তব্য করুন