দেশের অধিকাংশ ভূমি অফিসে অর্ধেকের কম বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশ জনবল থাকার যে চিত্র শনিবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, তা 'অস্বাভাবিক' হতে পারে না। সারাদেশে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রায় সাড়ে তিন হাজার কার্যালয়ের জন্য অনুমোদিত কমবেশি ২৬ হাজার পদের মধ্যে ১০ হাজারই যদি শূন্য থাকে, তাহলে এ চিত্রই 'স্বাভাবিক' নয় কি? আমরা জানি, সব মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরেই এভাবে অনুমোদিত পদের তুলনায় নিয়োজিত জনবলের সংখ্যা কম। চলতি মাসেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কমবেশি তিন লাখ ৮০ হাজার পদ শূন্য। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এতে বিস্মিত হওয়ার অবকাশ নেই।

কিন্তু ভূমি প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের যে চিত্র সমকালে প্রকাশ হয়েছে, তা বিস্ময়কর এ কারণে যে, ১৭ বছর ধরে সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়াই বন্ধ। এর ফলে এই দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রম যে ব্যাহত হচ্ছে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এ আশঙ্কাও অমূলক হতে পারে না, ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো জটিল ও সর্বসংযুক্ত একটি খাতে জনবল সংকটের বিরূপ প্রভাব প্রশাসনিক অন্যান্য ক্ষেত্রেও পড়তে বাধ্য। বিশেষত, ভূমি-সংক্রান্ত যেসব জটিল মামলা ও আইনি বিষয় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে, সেগুলো আরও দীর্ঘসূত্র হয়ে পড়তে পারে কেবল যথাস্থানে জনবল সংকটের কারণে।

এতে করে সুশাসন যেমন দুরূহ হয়ে পড়তে পারে, তেমনই বাড়বে আর্থসামাজিক জটিলতা। এটাও মনে রাখা জরুরি, জনবল সংকটের বিরূপ প্রভাব পোহাতে হয় মাঠ প্রশাসনকে। কেবল জনবল ঘাটতির কারণে নয়, অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বদলে সদর এলাকাগুলোতে পদায়ন পেতে পছন্দ করেন। অথচ ভূমি প্রশাসনের ক্ষেত্রে প্রান্তিক এলাকাগুলোতেই যথাযথ জনবলের উপস্থিতি বেশি জরুরি। অনুমান করা কঠিন নয়, ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি বড় অংশের অবসর গ্রহণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ফলে যত দিন যাবে, মাঠ প্রশাসন ততই ফাঁকা হয়ে যাবে। আলোচ্য প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে- চাকরির বয়সসীমা অনুযায়ী বর্তমানে কর্মরত কানুনগোরা আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে অবসরে যাবেন। এ সময়ে সিংহভাগ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বা তহশিলদার ও ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তারাও অবসরে যাবেন। এমন চিত্র এখনই এ উদ্বেগ জাগায় যে, তখন ভূমি অফিসগুলোতে কাজ চলবে কীভাবে? আমরা আরও বিস্মিত এটা দেখে যে, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় এতদিন শীতনিদ্রায় ছিল। স্বীকার করতে হবে- নিয়োগ বন্ধ থাকার দায় মন্ত্রণালয়ের নয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে ২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে দায়ের করা মামলার কারণেই এ স্থবিরতা। কিন্তু এর আইনি প্রতিকারও কি অসম্ভব ছিল? যেমন এতদিন পর ভূমি মন্ত্রণালয়ের 'বোধোদয়' ঘটেছে যে, ওই ছয় মামলায় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে আদালত থেকে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা স্থিতাবস্থা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি অধিকতর যাচাই করতে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতও চাওয়া হয়েছে এরই মধ্যে। কবি জীবনানন্দ দাশ থেকে ধার করে আমরা তাই প্রশ্ন করতে চাই- 'এত দিন কোথায় ছিলেন?' আরও আগেই

যদি এই দিক খতিয়ে দেখা হতো, তাহলে এমন সংকট তৈরিই

হতো না। জনসাধারণকেও দীর্ঘদিন ধরে উপযুক্ত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হতো না। আমরা দেখতে চাই, আইনি জটিলতা অবিলম্বে নিরসনে মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এসব মামলার পেছনে অনেক সময়ই ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ থাকে। যেমন একটি মামলা রয়েছে কেবল

এই কারণে যে, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ হলে নতুনরা পুরোনোদের

থেকে পদের দিক দিয়ে এগিয়ে থাকবেন। কারণ, এরই মধ্যে তাদের গ্রেড উন্নীত করা হয়েছে। গোষ্ঠীবিশেষের এমন ঠুনকো যুক্তি ও

উন্নয়নবিরোধী মানসিকতার কারণে একটি মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকবে কেন? ভূমি মন্ত্রণালয়ে ১৭ বছর ধরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নীতিনির্ধারকরা এর দায় এড়াতে পারেন না। বিলম্বে হলেও

সংশ্নিষ্টরা দায় মোচন করুন।

বিষয় : ভূমি অফিস নিয়োগ বন্ধ

মন্তব্য করুন