স্থানীয় সরকার কাঠামোর প্রাথমিক স্তর ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউনিয়ন ও কয়েকটি পৌরসভার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে হতাহতের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মধ্য দিয়ে। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যথার্থই বলা হয়েছে, নিরুত্তাপ ভোটেও সহিংসতা। এই নির্বাচনের প্রচারাভিযান চলাকালেই বিভিন্ন ইউনিয়নে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনার পর আশঙ্কা ছিল, নির্বাচনের দিন তা আরও সহিংস রূপ নিতে পারে। বস্তুত অনেক ক্ষেত্রে হয়েছে তা-ই। শুধু প্রার্থীরাই নন, নাগরিক সমাজেরও অনেকে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন- নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা। বরিশালের গৌরনদী ও ভোলার চরফ্যাসনে তিনজনের প্রাণহানির পাশাপাশি আরও কয়েকটি ইউনিয়নে সংঘাত-সংঘর্ষে আহতের সংখ্যা কম নয়। যে কোনো মৃত্যুই বেদনার। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে প্রাণহানি আরও মর্মান্তিক। বেশ কিছু ইউনিয়নে অনিয়ম-অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলে প্রার্থীদের ভোট বর্জনের ঘটনাও ঘটেছে। কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগও উঠেছে সমান্তরালে। এমতাবস্থায় দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ২০৪টি ইউনিয়নে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে- নির্বাচন কমিশনের এমন দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আমরা জানি, স্থানীয় সরকারের ইউপি চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ইত্যাদি পদে নির্বাচন হয়ে আসছে দলীয়ভাবে। সুষ্ঠু, অবাধ, প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের অন্যতম শর্ত সব অংশীজনের জন্য 'সমতল ভূূমি' নিশ্চিত করার দাবিটি নতুন না হলেও নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার কাঠামোর এ নির্বাচনে তা কতটা নিশ্চিত করতে পেরেছিল- এটিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। ব্যালট ও ইভিএমে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল অংশ নিলেও আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যেই সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা বেশি ঘটেছে। লক্ষ্মীপুর-২ সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন হয়েছে একই তারিখে। অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে ২০৪টি ইউপির মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ২৮ জন। আমরা দেখছি, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশন ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয়ই দিয়ে যাচ্ছে। কেবল সংঘাত-সহিংসতাই নয়; নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রায় ক্ষেত্রেই অস্বচ্ছতার অভিযোগের বৃত্ত ভেদ করে বের হয়ে আসতে পারছে না ইসি। অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাধারণত গ্রামীণ পর্যায়ে অন্যরকম উৎসব হিসেবে দেখা গেছে। কিন্তু নির্বাচনকেন্দ্রিক নানামুখী সহিংসতা ও অনিয়মের কারণে এই গ্রামীণ ভোট পর্বও এর ঐতিহ্যবাহী মেজাজ ধরে রাখতে পারেনি। আমরা জানি, নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাই মনে করি, এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের 'কানে দিয়েছি তুলো, পিঠে বেঁধেছি কুলো'- এ রকম অবস্থানের কোনোই অবকাশ নেই। চলমান করোনা দুর্যোগে দ্বিতীয় ঢেউ যখন ক্রমেই স্ম্ফীত হয়ে উঠছে, তখন নির্বাচনকেন্দ্রিক হতাহতের ঘটনা জনমনে বাড়তি চাপ সৃষ্টির কারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ইউপি নির্বাচনের আরও কয়েকটি ধাপ বাকি। আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে অব্যবস্থা-অপূর্ণতার সাক্ষ্য থেকেই যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় যে অপূর্ণতা, তা হচ্ছে প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনে আমরা সবার অংশগ্রহণ দেখিনি। এ ছাড়া জনগণের রায় ছাড়াই অনেক প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমনটি জনগণের ভোটাধিকার খর্বের শামিল। আমরা চাইব, ভবিষ্যতে যাতে এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। নির্বাচন যেন হয় সবার অংশগ্রহণে ও গ্রহণযোগ্য। আমরা জানি, নির্বাচন কমিশন নিয়েও নাগরিক অসন্তোষ প্রবল। দেশের ৪২ বিশিষ্ট নাগরিক ইতোপূর্বে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে লিখিত আবেদন করেছিলেন। স্থানীয় সরকারের 'নিরুত্তাপ' নির্বাচনেও রক্তপাত সেই অভিযোগগুলোকে শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার যে পারদ নেমে গেছে; এর পুনরুদ্ধারের দায় তাদেরই। আইন অনুযায়ী নির্বাচনকালীন শৃঙ্খলাসহ আনুষঙ্গিক সবকিছু নিশ্চিত করতে কমিশন যে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে এবং সরকার কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের সহযোগিতা দিতে বাধ্য। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশন তাদের ক্ষমতা যথাযথভাবে ব্যবহার করে কেন সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারছে না- এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় তাদেরই। আমাদের প্রত্যাশা, পরবর্তী ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন এই আলোকেই সব রকম ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।

বিষয় : ইউপি নির্বাচন

মন্তব্য করুন