পুরান ঢাকার আটটি থানা এলাকায় সমান্তরালে রয়েছে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন। একদিকে ঘনবসতি, অন্যদিকে রয়েছে রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ, বিস্ম্ফোরক জাতীয় দ্রব্যের গুদাম ও কারখানা এবং চলাচলে রাস্তার অপর্যাপ্ততা, যা জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বুধবার সমকালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরান ঢাকার আটটি থানার ৪৪ এলাকা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। পুরান ঢাকার আবাসিক অনেক ভবনেই কী বিপজ্জনকভাবে রাসায়নিক দাহ্য ও বিস্ম্ফোরক পদার্থের ব্যবসা জীবনের জন্য চরম হুমকি হয়ে আছে তা আমরা দেখেছি নিমতলী থেকে চকবাজারের চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মর্মন্তুদ পরিণতির মধ্য দিয়ে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে অনেকের হতাহতের পরিপ্রেক্ষিতে পুরান ঢাকার অগ্নিঝুঁকির বিষয়টি ফের সামনে এসেছে। সমকালের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কমবেশি ১৩০০ ভবনের বিপদাশঙ্কা অনেক বেশি। পুরান ঢাকার রাসায়নিক পদার্থের গুদাম-কারখানা স্থানান্তরের দাবি শুধু নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেই বারবার ওঠেনি, সরকারের সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল।

কিন্তু জননিরাপত্তা-সংক্রান্ত এত বড় বিষয়টি নিয়ে দায়িত্বশীলদের কর্মপরিকল্পনা প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা জানি, বিগত এক দশকে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের হতাহতের পাশাপাশি ব্যাপক সম্পদহানিও ঘটেছে। তারপরও আমরা দেখছি- অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ও একই সঙ্গে সরকারের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবিড় তদারকির ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি। পুরান ঢাকার এক একটি ট্র্যাজেডি দায়িত্বশীলদের জাগিয়ে তুললেও তাদের তৎপরতা ও করণীয় বিষয়গুলো অচিরেই তারা ভুলে গেছেন। চরম জীবনাশঙ্কার এত উপসর্গ জিইয়ে থাকা পুরান ঢাকার জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশও রয়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে। আমরা দেখেছি, সেখানকার অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম চালানোও কত দুরূহ। প্রাকৃতিক পানির উৎস তো নেই-ই, ফায়ার ব্রিগেডের কাজ করাও কতটা প্রতিকূল। আমরা জানি, রাসায়নিক দাহ্য বা বিস্ম্ফোরক পদার্থের ব্যবসা, মজুদ, রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্নিষ্টদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। কিন্তু পুরান ঢাকায় সরকারের সব রকম নীতিমালা উপেক্ষা করেই চলে আসছে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা। মানুষের জীবন চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর অসাধুদের 'ম্যানেজ' করে ব্যবসার নামে পুরান ঢাকায় যে বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড চলছে তাতে বলা যায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বসবাস করছে বোমার ওপর।

বিশেষজ্ঞ মহলসহ সরকারের গোয়েন্দা ও অন্য আইনি সংস্থার সুপারিশের পরও দাহ্য পদার্থের গুদাম ও ব্যবসা নিরাপদ স্থানে সরানোর ক্ষেত্রে যে 'শম্ভুক গতি' লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। নিমতলী থেকে চকবাজারের চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তযোগ্য বিচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও থেকে গেছে অনিষ্পন্ন। পরিকল্পিত রাসায়নিক শিল্প অঞ্চল গড়ে পুরান ঢাকার সব রাসায়নিক গুদাম ও দাহ্য পদার্থের নিরাপদ পরিবেশ কেন আজও গড়ে তোলা সম্ভব হলো না- এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এড়াতে পারে না। নিমতলী থেকে চকবাজার পর্যন্ত মর্মস্পর্শী ঘটনাগুলো মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয় বললেও অত্যুক্তি হবে না। আমরা আশা করেছিলাম, পুরান ঢাকার অগ্নিকাণ্ডের উৎসগুলো সমূলে উৎপাটিত হবে।

আমরা জানি, নিমতলীর ভয়াবহ ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছু সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল রাসায়নিক দাহ্য ও বিস্ম্ফোরক পদার্থের গুদাম স্থানান্তর করে পুরান ঢাকায় নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা। এই অনুমান অমূলক হতে পারে না যে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বাস্তবায়ন হলে চকবাজার ট্র্যাজেডির সৃষ্টি হতো না। অভিযোগ আছে, রাসায়নিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের অনেকেই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী হওয়ায় কোনো সিদ্ধান্তই কার্যকর হচ্ছে না। আমরা মনে করি, রাজনীতিতে স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে বলেই জনআকাঙ্ক্ষা-দাবি অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, পুরান ঢাকার জননিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিলম্বে হলেও করণীয় সবকিছু আশু নিশ্চিত করা হবে। মানুষের বসবাসের ক্ষেত্র মৃত্যুকূপ হয়ে থাকতে পারে না।

মন্তব্য করুন