ঢাকায় নির্মিত বাংলা চলচ্চিত্র 'রেহানা মরিয়ম নূর' সদ্য সমাপ্ত কান চলচ্চিত্র উৎসবে 'অফিসিয়াল সিলেকশন' হওয়া নিঃসন্দেহে বড় মাইলফলক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের যদিও সমৃদ্ধ ইতিহাস ও গৌরবময় অতীত রয়েছে; যদিও বঙ্গীয় ব-দ্বীপের এই ভূখণ্ডের অনেক নির্মাতা ও কলাকুশলী উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন; ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসবের মতো বৈশ্বিক আসরে আমাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান, প্রাচীন ও প্রভাবশালী এই মঞ্চে কলকাতায় নির্মিত বাংলা চলচ্চিত্রের উপস্থিতি যদিও মাঝে মধ্যেই দেখা যায়; ঢাকায় নির্মিত চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এই হার এতদিন শূন্য বললেও অত্যুক্তি হতো না। আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ নির্মিত 'রেহানা মরিয়ম নূর' এক অর্থে দেশে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র যা এই বিরল সম্মান বয়ে এনেছে।

আমরা জানি, ২০০২ সালে প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ নির্মিত 'মাটির ময়না' চলচ্চিত্রও কান উৎসবে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু সেটা ছিল মূল প্রতিযোগিতার বাইরে 'প্যারালাল' আয়োজনে, মূলত পরিচালক হিসেবে তারেক মাসুদের ওপর আলোকপাত করে। রেহানা মরিয়ম নূর প্রথম চলচ্চিত্র যা মূল প্রতিযোগিতার অংশ 'আঁ সার্তেইন রিগার্দ' বিভাগের জন্য দাপ্তরিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে। স্বীকার করতে হবে, ১৫টি দেশ থেকে নির্বাচিত ১৮টি চলচ্চিত্রের মধ্যে বাংলাদেশের এই সিনেমা শীর্ষস্থান অধিকার করতে পারেনি বা পুরস্কৃত হয়নি। কিন্তু প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হওয়ার এই সম্মান তাতে ঔজ্জ্বল্য হারায় না। আমরা বিশ্বাস করি, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে নতুন ধারা সূচিত হলো, তা অনাগত দিনগুলোতে আরও অনেককে অনুপ্রাণিত করতে থাকবে। কান ছাড়াও একই ধরনের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে পুরস্কার বয়ে আনতে সক্ষম হবে।

'রেহানা মরিয়ম নূর' চলচ্চিত্রের পরিচালক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, প্রধান চরিত্র আজমেরী হক বাঁধনসহ এর অন্যান্য কলাকুশলীকে আমরা অভিনন্দন ও অভিবাদন জানাই। বৈশ্বিক মঞ্চে তারা যেভাবে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, যেভাবে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, দেশবাসী তা মনে রাখবে। বস্তুত চলচ্চিত্রটি দাপ্তরিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে নাগরিকদের যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তাতে জাতীয় উচ্ছ্বাসই প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা এও বিশ্বাস করি, উৎসবে অংশগ্রহণ ও তাতে পুরস্কার বিজয়ই কোনো চলচ্চিত্রের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। তারা যে বাংলাদেশের জনসাধারণের হৃদয় জয় করেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। তারা আগামীতেও এভাবে নিজেদের কাজ ও নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রশংসিত ও অভিনন্দিত হতে থাকবেন।

একই সঙ্গে এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবে আরও যে দুটি সাফল্যের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব রয়েছে, সেগুলোকেও আমরা অভিনন্দিত করতে চাই। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের একদল কিশোরী ফুটবল খেলোয়াড় ও তাদের প্রশিক্ষককে নিয়ে নির্মাণাধীন 'মুন্নী' শিরোনামে একটি তথ্যচিত্র কান উৎসবের সমান্তরাল আয়োজন 'ডকস ইন প্রগ্রেস' বিভাগে 'ফিল্ম ইন ইমপ্যাক্ট' পুরস্কার জয় করেছে। এই পুরস্কার কেবল তথ্যচিত্র নির্মাতাদের নয়, আর্থ-সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতায় পিছিয়ে থাকা নারীদেরও অনুপ্রাণিত করবে। আমরা এর নির্মাতা ও কলাকুশলীদেরও সাধুবাদ জানাই।

একই উৎসবের আরেকটি সমান্তরাল আয়োজনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ও মিস আয়ারল্যান্ড খেতাবে ভূষিত মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি যে 'টপ মডেল' নির্বাচিত হয়েছেন, সেজন্যও আমরা নিশ্চয়ই আনন্দিত। বস্তুত এবারের কান উৎসব বাংলাদেশের জন্য খুলে দিয়েছে বেশকিছু নতুন জানালা। আমরা দেখতে চাই, এসব জানালা দিয়ে আসা রোদ, আলো ও হাওয়া চলচ্চিত্র কিংবা তথ্যচিত্রে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা স্যাঁতসেঁতে আবহ দূর করবে। চাঙ্গা হয়ে উঠবে দেশের শিল্পাঙ্গন। এক্ষেত্রে যেমন রাষ্ট্রীয়, তেমনই ব্যক্তি খাতের উদ্যোগ ও সহযোগিতা যে প্রয়োজনীয়, সে কথা এ উপলক্ষে আমরা আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই। উৎসব ও আয়োজনের বর্ণিল আলোচ্ছটার পেছনে সংগ্রাম ও বঞ্চনার যেসব অন্ধকার থাকে, সেগুলো দূর করতে সব পক্ষের ইতিবাচক অবস্থান যে জরুরি ভুলে যাওয়া চলবে না। দেশের চলচ্চিত্র শিল্প যদি এখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বর্তমান হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং নাগরিকদের চিত্তবিনোদনের স্বর্ণালি যুগ ফিরিয়ে আনতে পারে, সেটিই হবে এবারের কান উৎসবে বাংলাদেশের উৎসাহব্যঞ্জক অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

মন্তব্য করুন