করোনা মহামারির মধ্যেই যেভাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, তাতে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা দেখছি, রাজধানীর হাসপাতালে ডেঙ্গু সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীর ভিড় বাড়ছে। সোমবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, চলতি মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় দেড় হাজার ডেঙ্গু রোগী। করোনা আক্রান্ত রোগীর আধিক্যের কারণে যখন হাসপাতালে শয্যা পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন ডেঙ্গু রোগীর এ বাড়তি চাপ স্বাভাবিকভাবেই নগরবাসীর আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। গত বছর ডেঙ্গুতে কম আক্রান্ত হওয়ার কারণে কর্তৃপক্ষ ও নগরবাসী সেভাবে সচেতন হননি বলে এবারের ডেঙ্গুর ধাক্কাটা স্পষ্ট। মে-জুন মাসে মশার বংশবিস্তার উপযোগী বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতা বেশি থাকায় জুন মাসের শুরুতেই বিশেষজ্ঞরা এবার মশার দৌরাত্ম্য বেশি হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া বিস্ময়কর। এডিস মশার কার্যক্রমে মূল ভূমিকা পালনকারী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন শুরু থেকেই সচেতন বলে যে দাবি করছে, তা বাস্তবতার ধোপে টেকে না। বিশেষ করে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ওষুধ ছিটানো ছাড়া তেমন কোনো নিয়মিত কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না।

যদিও সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। আমাদের মনে আছে, ২০১৯ সালে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ওই সময় এক লাখেরও বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার তথ্যমতে, সে বছর মৃত্যু হয় ১৪৮ জনের। তখন গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের গাফিলতি ছিল ডেঙ্গুর প্রকোপ এত বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এরপরও তারা সেভাবে তৎপর হয়নি। কারণ সিটি করপোরেশন ঢিমেতালে 'মৌসুমি কাজ' হিসেবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মশক নিধনে সমন্বিতভাবে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এ কাজে কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা-অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে অনেক। মশার লার্ভা নিধনের ওষুধের অকার্যকারিতা ও ওষুধ ছিটানোর অভিযোগ পুরোনো। করোনা মহামারির কারণে যখন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে সংকটে, সেই সময়ে ডেঙ্গ জ্বরের প্রকোপ আরও বাড়তে থাকলে তা হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মতো। তাই রাজধানীর বিভিন্ন স্থান জীবাণুমুক্ত করার পাশাপাশি মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার বিকল্প নেই। জুন থেকে সেপ্টেম্বর- এই চার মাস ডেঙ্গুর মূল সময় হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের তাপমাত্রা সারাবছর এডিস মশা জন্মানোর উপযোগী। ফলে দেখা যাচ্ছে, বছরের যে কোনো সময়েই মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। গত বছরের পুরো ১২ মাসের সঙ্গে এ বছরের জুলাই মাসের তুলনা করলে আক্রান্ত এ সময়ে বেশি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দায় কেবল সিটি করপোরেশনের একার নয়। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবেশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এখন জরুরি।

প্রত্যেককেই সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করা বিশেষ করে বাসাবাড়িতে ফুলের টব, ছাদ কিংবা অন্য কিছুতে যাতে তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। স্বস্তির বিষয় হলো, ইতোমধ্যে কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়র বলেছেন, কোনো ভবনের নিচে পানি ও ময়লা-আবর্জনা জমে থাকলে সেই ভবনের মালিকই দায়ী থাকবেন। তবে ডেঙ্গুর প্রকোপ যেহেতু ঊর্ধ্বমুখী, সে ক্ষেত্রে আক্রান্তদের চিকিৎসার বিষয়টিও সমানভাবে ভাবতে হবে। সমকালের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। আমরা মনে করি, সাধারণের কথা চিন্তা করে সরকারি হাসপতালেও বিশেষায়িত এ সেবা বাড়ানো প্রয়োজন। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসায় আলাদা হাসপাতাল নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন। ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতালসহ যেসব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার কথা মন্ত্রী বলেছেন, সেখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেই হবে।

মন্তব্য করুন