মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে 'মরা তিস্তা জাগল দুইশ বছর পর' শিরোনামের মধ্যেই রয়েছে আশার আলো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নদনদী মরে যাওয়ার বেদনাদায়ক খবর দেখে দেখে যখন আমরা হতাশ ও বিক্ষুব্ধ, তখন রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা থেকে উঠে আসা এই চিত্র আমাদের আশান্বিত না করে পারে না। আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- প্রায় আড়াই শতাব্দী আগে তিস্তার মূল স্রোত গতিপথ পরিবর্তন করলে এর অন্যতম প্রাচীন ধারা কালের বিবর্তনে হারিয়ে গিয়েছিল। কোথাও ধানী জমি, কোথাও গো-চারণভূমি, আবার কোথাও বসতবাড়ি বা পুকুর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল একদা প্রমত্ত এই নদী। যেখানে এখনও প্রবহমান নদীর দখল উচ্ছেদ করাই কঠিন; সেখানে বলতে গেলে হারিয়ে যাওয়া একটি নদীর ফিরে আসা নিশ্চয় সাড়া জাগানো ঘটনা। ওই অঞ্চলের চিকলী নদীকে যমুনেশ্বরীর সঙ্গে সংযুক্তকারী এই নদীর দৈর্ঘ্য যদিও মাত্র সাড়ে ১৩ কিলোমিটার; এই সাফল্যকে নিছক কিলোমিটারে পরিমাপ করা উচিত হবে না। বস্তুত এর মধ্য দিয়ে কেবল রংপুর নয়, গোটা দেশের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে একটি উদাহরণ। বিশেষত মরা তিস্তার ক্ষেত্রে এলাকাবাসীর সঙ্গে সভা করে নদীর দখল হওয়া জমি স্বেচ্ছায় ফিরিয়ে দেওয়ার যে নজির প্রশাসন দেখাতে পেরেছে, তা দেশের অন্যত্রও অনুসৃত হতে পারে। এ জন্য আমরা বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে নিশ্চয় সাধুবাদ জানাই। পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বৃহত্তর রংপুর জেলায় সেচ সম্প্রসারণ নামে যে প্রকল্পের মাধ্যমে খাল, ছোট নদী খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তারও সাফল্য কামনা করি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, খনন বা পুনরুদ্ধারই শেষ কথা নয়। উদ্ধারকৃত নদীর কাঠামো ও প্রবাহ টেকসই রাখা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। যদি নদীটি ফের প্রাণ ও কাঠামো হারিয়ে ফেলে, তাহলে সকলই গরল ভেল! তখন বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের প্রশ্নটিই সামনে আসবে। এ জন্য উদ্ধার ও খননের পর দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণ খুবই জরুরি। এও ভুলে যাওয়া চলবে না যে, রংপুর অঞ্চলেই এভাবে খননকৃত একাধিক নদীর ফের প্রবাহ হারিয়ে ফেলার নজির রয়েছে। মরা তিস্তার ক্ষেত্রে আমরা এর পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। এ ছাড়া আরও যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশের মতো ব-দ্বীপ অঞ্চলে বিশেষ কোনো নদীকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার অবকাশ নেই। এখানে 'রিভার সিস্টেম' বা নদী ব্যবস্থার অংশ সব নদীই পরস্পর সম্পর্কিত। যেমন চিকলী নদীতে যদি যথাযথ প্রবাহ না থাকে, তাহলে শুধু মরা তিস্তা খনন শেষ পর্যন্ত কাজে আসবে না। যে কারণে মরা তিস্তার পুনরুদ্ধার কার্যক্রম টেকসই করতে হলে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার সব নদীরই সচলতা ও সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও বহুপক্ষীয় উদ্যোগ এবং আন্তরিকতা। স্বীকার করতে হবে, কাজটি সহজ নয়। এও অনস্বীকার্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নদী উদ্ধার প্রশ্নে দৃঢ়তম অবস্থান গ্রহণ করেছে। তার চার মেয়াদের শাসনামলে নীতি ও আইনগত প্রস্তুতি ছাড়াও নদী সুরক্ষার কাজ মাঠ পর্যায়ে গড়িয়েছে। আমাদের উচ্চ আদালতও নদী সুরক্ষায় যেসব রায় দিয়েছেন, সেগুলো অন্যান্য দেশের জন্যও উদাহরণ। বছর দুয়েক আগে দেশের সব নদনদীকে আইনি বা জীবন্ত সত্তা ঘোষণা নিঃসন্দেহে নদীর অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছে। কয়েক বছর আগে গঠিত জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনও প্রতি বছর দখলদারের তালিকা প্রকাশ করে চলেছে। কিন্তু নদীমাতৃক এই দেশের সব নদনদীর প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার পথ এখনও অনেকটা বাকি। আমরা জানি, বর্তমানে বাংলাদেশের নদনদীর মূল সংকট পাঁচটি- দখল, দূষণ, প্রবাহস্বল্পতা, নির্বিচার বালু উত্তোলন ও অপরিকল্পিত স্থাপনা। খনন কার্যক্রমের পাশাপাশি নদনদীর অন্যান্য সংকট মোচনেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা মনে করি, এখন সবচেয়ে জরুরি নদী উদ্ধার ও সংরক্ষণের জন্য উদাহরণ তৈরি করা। মরা তিস্তা এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত নজির হতে পারে, যদি এ উদ্ধার কাজ টেকসই হয়।

মন্তব্য করুন