করোনা মহামারি প্রতিরোধে টিকা কার্যক্রমের সুফল বিশ্বব্যাপী স্পষ্ট হলেও নানা প্রতিবন্ধকতায় দেশে গণটিকাদান কার্যক্রম সেভাবে শুরু করা যায়নি। স্বস্তির বিষয় হলো, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৭ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে গণটিকা কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে এ কার্যক্রম শুরু হলেও মাঝে সৃষ্ট টিকা সংকট কাটিয়ে ওঠার বিষয়টি আমরা ইতিবাচক বলেই মনে করি। তবে টিকা কার্যক্রম চলমান সংকট উত্তরণের প্রধানতম উপায় বলে এর গতি দ্রুততর করার বিকল্প নেই। কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ৪৩ লাখ মানুষ দুই ডোজ অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ টিকা সম্পন্ন করেছে। তার মানে, টিকার আওতার বিপুল অধিকাংশ এখনও বাকি রয়ে গেছে। উল্লেখযোগ্য অংশকে টিকার আওতায় আনতে সরকারকে বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন দেশ থেকে যেমন টিকা আনার চুক্তি অব্যাহত রাখতে হবে; তেমনি দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে টিকার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে ক'দিন ধরে যে ধরনের অব্যবস্থাপনা আমরা দেখছি, তা হতাশাজনক। বিশেষ করে টিকাকেন্দ্রে মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার যে চিত্র সংবাদমাধ্যমে আসছে, তা উদ্বেগজনক।

আমরা মনে করি, বাড়তি চাপ মোকাবিলায় টিকাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নেই। করোনার টিকা যখন গ্রাম পর্যায়ে দেওয়া হবে তখন স্বাভাবিকভাবেই নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা জরুরি হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে প্রশাসনের তরফ থেকে বলা হয়েছে, অনলাইন নিবন্ধন না করেও গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে স্থাপিত টিকাকেন্দ্রে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে গেলেই টিকা পাওয়া যাবে। এমনকি বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদ নেই; এমন ব্যক্তিদেরও বিশেষ ব্যবস্থায় টিকা দেওয়া হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকারের এ নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা হবে এবং কাউকে এ জন্য বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হবে না। পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৮ বছর পর্যন্ত সবাইকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। যাদের বয়স সম্প্রতি ১৮ হয়েছে কিন্তু প্রক্রিয়াগত কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে পারেনি, যাতে জন্ম নিবন্ধন সনদ দিয়ে টিকা নিতে পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে টিকা নিতে আগ্রহী করতে মানুষের মাঝে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা দরকার।

আমরা দেখছি, টিকা বিষয়ে অনেকের মাঝে এক ধরনের সন্দেহ ও সংশয় রয়েছে। ইতোমধ্যে এ নিয়ে যে গুজব ছড়ানো হয়েছে, তাতে গণসচেতনতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বাস্তব নানা প্রয়োজনেও যে টিকার সার্টিফিকেট প্রয়োজন হবে, তা বোঝানো গেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরও টিকা উৎসব আমরা দেখতে পাব। টিকা কারা নিতে পারবে, কীভাবে দেওয়া হবে, এ তথ্যও সমানভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। টিকা কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিষয় নয়। তাই যত দ্রুত সম্ভব অধিকাংশকেই এর আওতায় আনা জরুরি। দেশে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এখনও স্পষ্ট। প্রতিদিন যেভাবে করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে, তা থেকে উত্তরণে সচেতনতা কিংবা লকডাউনের মতো কর্মসূচি যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি গণটিকা কার্যক্রম। আমরা জানি, বিশ্বের অন্যান্য দেশ টিকা কার্যক্রমের মাধ্যমেই করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তাই প্রশাসনকে টিকা কার্যক্রমে তৎপর হতেই হবে।

টিকা কার্যক্রম পরিচালনায় দেশে বিদ্যমান সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি শিশুদের টিকা প্রদানে সফলতার উদাহরণ। এর মাধ্যমে সারাদেশে স্বল্প সময়ে পোলিও, হাম, রুবেলা প্রভৃতি টিকা প্রদান করা হয়। করোনা টিকার কার্যক্রম সহজ করতে এ কর্মসূচির অবকাঠামো ও জনবল যথাযথভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। এ ছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও করোনার টিকার এ মহাযজ্ঞে অন্তর্ভুক্ত করলে সুফল পাওয়া যাবে। করোনা থেকে সুরক্ষায় দেশের অধিকাংশ মানুষকে টিকা দিতে হবে বলে সম্ভাব্য সব চ্যালেঞ্জ নিয়েই গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু করা চাই। মাঝে কোনো কারণে এ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা অধিকাংশ মানুষকে টিকা দিতে না পারলে পুরো কার্যক্রম হুমকিতে পড়তে পারে। বিনামূল্যে সবাইকে টিকা দেওয়ার মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেভাবে টিকা কার্যক্রমে গতি আনার আহ্বান জানিয়েছেন, তা আশা-জাগানিয়া। আমাদের বিশ্বাস, করোনার টিকা কার্যক্রমের সফলতার মাধ্যমে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যেমন ফিরে আসবে, তেমনি বাধাগ্রস্ত অর্থনীতি, শিক্ষাসহ সব খাত স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হবে।

মন্তব্য করুন