পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে লক্ষাধিক মানুষ এবং প্রশাসন থেকে বিভিন্ন সতর্কতামূলক বার্তা ও পদক্ষেপ সত্ত্বেও তাদের 'নিরাপদ' আশ্রয়ে সরানো যাচ্ছে না- বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এই চিত্র কক্সবাজারের হলেও এমন পরিস্থিতি শুধু ওই এলাকার নয়। চট্টগ্রাম মহানগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জেলাই বর্ষাকালে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকে এবং প্রায় প্রতিবছর প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এবারও গত দুই দিনে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে মৌসুমি এই দুর্যোগে। তারপরও পরিস্থিতি তথৈবচ। আমরা মনে করি, এর বড় কারণ প্রশাসনের 'মৌসুমি' তৎপরতা।

বছরজুড়ে বিভিন্ন পাহাড়ে যারা ঘর-সংসার পেতেছে, প্রায়-ছিন্নমূল এসব মানুষ মাত্র কয়েক মাসের জন্য 'নিরাপদ' আশ্রয় কোথায় পাবে? প্রশ্নটি শুধু পাহাড়ে বসবাসরতদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ও নয়। ধসের যে মূল কারণ, সেই বিসবুজীকরণ ও পাহাড় কাটা বন্ধ না করে শুধু মানুষ সরিয়ে কি পাহাড়ধস ঠেকানো যাবে? এতে কিছু প্রাণ নিশ্চয়ই রক্ষা পাবে; কিন্তু খোদ পাহাড়ের 'প্রাণহানি' ঠেকানো যাবে না। বস্তুত পাহাড়ধসের দুর্যোগ এবং প্রশাসনের পদক্ষেপ আমাদের সেই পুরোনো প্রবাদই মনে করিয়ে দেয়- সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। আমরা জানি, বর্ষাকাল এলেই পাহাড়, সমুদ্র ও নদীঘেরা চট্টগ্রাম অঞ্চল শুধু আরও সবুজ হয়ে ওঠে না; পাহাড় ধসে হতাহতদের বেদনায় নীলও হতে থাকে। প্রতিবছর প্রশাসনের সভা হয়, ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের তালিকা হালনাগাদ হয়, কিছুদিন পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সতর্কতামূলক মাইকিং হয়।

কিন্তু পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারী খুব কম মানুষই এসবে কান দেয়। পরিণতিতে হারাতে হয় মূল্যবান প্রাণ। এ নিয়ে কয়েক দিন সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় চলে; প্রশাসনের পক্ষে তদন্ত কমিটি হয়; ত্রাণ তৎপরতা চলে; সেই সঙ্গে চলে উচ্ছেদ অভিযান। তারপর মৃত মানুষগুলো নিছক সংখ্যায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে ফিরে আসে পাহাড়ের বেআইনি বাসিন্দারা। চোখের সামনে নতুন করে বসতি হয়, পাহাড় কাটা চলে, চলে বিসবুজীকরণ। আমাদের প্রশ্ন- বছরের পর বছর প্রাণঘাতী এই চক্র চলতেই থাকবে? আমরা মনে করি, প্রথমেই নজর দেওয়া উচিত পাহাড়ে বসতি স্থাপন প্রক্রিয়ার দিকে। এটা স্পষ্ট যে, এসব বসতির পেছনে থাকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালীরা। তারাই মাসোহারা তুলতে বা কখনও প্রাথমিক দখল সম্পন্ন করতে ছিন্নমূল মানুষকে এনে বসতি গড়ে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তের অপর পাশ থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে এ চিত্র আরও প্রকট। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাহাড় কাটা ও বসতি স্থাপন করে দখলে নেওয়ার নেপথ্যে যে খলনায়করা থাকে, তাদের আনতে হবে বিচারের আওতায়। অন্যথায় বছর বছর উচ্ছেদ অভিযানের নামে শুধু উপরিকাঠামো মাজাঘষাই সার হবে।

আমরা গভীর হতাশার সঙ্গে দেখে আসছি, পাহাড় দখল ও বিনষ্টে জড়িতরা অচিহ্নিত নয়। বিভিন্ন সময়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তাদের সবার নাম-ধাম উল্লেখ রয়েছে। তারপরও কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? আমরা বিশ্বাস করি, প্রশাসন আন্তরিক এবং বছরজুড়ে সক্রিয় থাকলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। নিম্নবিত্ত মানুষকে পাহাড় থেকে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। পুনর্দখল বন্ধ না করে বছর বছর উচ্ছেদে কী লাভ? একই সঙ্গে তাদের বিকল্প বাসস্থান ও জীবিকার কথা ভাবতে হবে। বিশেষত করোনা পরিস্থিতিতে যেখানে দৈনন্দিন খাবার জোগাড় করাই কঠিন, তখন নির্বিচার উচ্ছেদ সৃষ্টি করতে পারে মানবিক সংকট।

পাহাড়ে পুনর্বসতি রোধে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নিতে বলব আমরা। স্বীকার করতে হবে, গত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম মহানগরীতে পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু প্রত্যন্ত জেলাগুলোতে পরিস্থিতি এখনও কতটা নাজুক; কক্সবাজারে গত দুই দিনের পাহাড়ধস তা প্রমাণ করেছে। আমরা চাই গোটা পাহাড়ি অঞ্চলেই ধস রোধে নেওয়া হবে সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে।

মন্তব্য করুন