প্রবাসী কর্মীদের করোনা পরীক্ষার জন্য বিমানবন্দরে ল্যাব স্থাপনের আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ফের এ ব্যাপারে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা আমাদের ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত না করে পারে না। বিমানবন্দরে করোনার র‌্যাপিড পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় কর্মস্থলে ফিরতে প্রতিকূলতার মুখে পড়েছেন প্রবাসীরা। আমাদের মনে আছে, ৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল দু-তিন দিনের মধ্যে ল্যাব স্থাপনের। কিন্তু আজও ল্যাব স্থাপনে নেই কোনো অগ্রগতি। এর ফলে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছেন বিদেশগামীরা। বাধ্য হয়ে আমিরাত প্রবাসীরা অনশনও করেন। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সামনে তাদের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী মঙ্গলবার অনশনকারীদের আশ্বস্ত করেন, দু-একদিনের মধ্যে বিমানবন্দরে র‌্যাপিড পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।

এই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে আমিরাত প্রবাসীরা অনশন ভঙ্গ করলেও সমকালের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ওই দিন রাত পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত সরকারি কমিটিগুলোর দুটি বৈঠক হলেও বিমানবন্দরে ল্যাব স্থাপনের কাজ কোন কোন প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে, তা চূড়ান্ত করা যায়নি। এর তিন দিন আগে সমকালের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, বিদেশগামী কর্মীদের করোনা পরীক্ষার জন্য বিমানবন্দরে স্বল্প সময়ের মধ্যেই আরটিপিসিআর ল্যাব স্থাপনের সক্ষমতা রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের। দক্ষতার মানদণ্ডের নিরিখেও তাদের অবস্থান ভালো। প্রশ্ন হচ্ছে- তাহলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সন্ধানে সময়ক্ষেপণ কেন? জানা গেছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষায় খরচও পড়বে কম। অভিযোগ আছে, বেসরকারি যে প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে তোড়জোড় চলছে, এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এক মহাপরিচালকের। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও সুনির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে নির্দেশনার পরও বিলম্বের হেতু অনেক প্রশ্নই দাঁড় করায়।

আমরা দেখেছি, করোনা-দুর্যোগে স্বাস্থ্য খাতের নানা অসংগতি, অনিয়ম ও ব্যক্তি বা মহল বিশেষের দুর্নীতির চিত্র। আমরা জানি, এই অঞ্চলের দেশ নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও প্রতিবেশী ভারতের প্রবাসীদের যাতে কোনো বিড়ম্বনা পোহাতে না হয়, পড়তে না হয় ঝুঁকির মুখে- এ জন্য তারা বিমানবন্দরে র‌্যাপিড পরীক্ষার ব্যবস্থা দ্রুততার সঙ্গে করে। আমাদের দেশেও একই সুবিধা চালু করতে আমিরাত প্রবাসীরা গত জুন থেকে দাবি জানিয়ে আসছেন। জুলাই থেকে তারা পালন করছেন রাস্তার কর্মসূচি। এর পরও ঘুম ভাঙছে না 'দায়িত্বশীল' মহলগুলোর। আমিরাতের শর্তানুযায়ী যাত্রার ৪৮ ঘণ্টা আগে পিসিআর টেস্ট করতে হবে এবং করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে বিমানে চড়তে হবে। প্রবাসীরা তো বটেই, দেশের স্বার্থেও এ ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র হেলাফেলার অবকাশ যেখানে দায়িত্বশীল কারোই নেই, সেখানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এর ব্যাখ্যা কী হতে পারে? প্রবাসী কর্মীদের আখ্যায়িত করা হয় 'রেমিট্যান্স যোদ্ধা' হিসেবে। যাদের কল্যাণে অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে, তাদের ব্যাপারে এমন উদাসীনতা কিংবা কালক্ষেপণের বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ব্যক্তি বা মহল বিশেষের কারণে জাতীয় স্বার্থ বিপন্ন হওয়ার দায়ও দায়িত্বশীলরা এড়াতে পারেন না।

করোনা দুর্যোগের কারণে এমনিতেই আমাদের প্রবাসী কর্মীরা রয়েছেন নানারকম ঝুঁকিতে। অনেকেই ইতোমধ্যে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এর আগে প্রবাসীদের করোনার পরীক্ষার ফি নিয়েও নেতিবাচক আলোচনার ঝড় উঠেছিল। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই তখন আমরা লিখেছিলাম, নাগরিকের অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্র তার দায় ভুলে যেতে পারে না। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে শুধু প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে। প্রবাসীরা যখন চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছেন এবং একই সঙ্গে যখন সরকার অর্থনৈতিক ক্ষতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে, তখন বিদ্যমান এই পরিস্থিতি অশুভ বার্তাই দিচ্ছে। অনতিবিলম্বে এই সমস্যার সমাধান করা বাঞ্ছনীয় সামগ্রিক স্বার্থ ও প্রয়োজনেই।

মন্তব্য করুন