সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঠ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসনের মধ্যে যে বিরোধ ধূমায়িত হয়ে উঠতে দেখা গেছে, উপজেলা চেয়ারম্যানের ক্ষমতা-সংক্রান্ত বিধান প্রতিপালনে হাইকোর্টের মঙ্গলবারের আদেশের সঙ্গে সেগুলোকে মিলিয়ে দেখার অবকাশ দৃশ্যত নেই। কিন্তু বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ার মধ্যেই সরকার ব্যবস্থার দুই অংশের মধ্যে বিরোধের অনেক উত্তর নিহিত রয়েছে। এটাও মনে রাখতে হবে, ইউনিয়ন পরিষদের কথা বাদ দিলে উপজেলা পরিষদই স্থানীর সরকার ব্যবস্থার বৃহত্তম অংশ। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ সচিবরা চেয়ারম্যানের অধীন কর্মচারী মাত্র। অপরদিকে উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান ও নির্বাহী কর্মকর্তার বিরোধের মূল কারণ হচ্ছে 'মুখ্য নির্বাহী' হিসেবে দায়িত্ব পালন নিয়ে। বস্তুত উপজেলা পরিষদের ক্ষমতা-সংক্রান্ত বিধান স্পষ্ট হলে পৌর ও জেলা পরিষদেও জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসকদের মধ্যে এখতিয়ারগত বিরোধের আশঙ্কা বহুলাংশে কমে যাবে।

স্বীকার করতে হবে যে, এখতিয়ারগত বিরোধের সমাধান সহজ নয়। কেবল উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও নন; সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের মধ্যেও আমরা একই ধরনের 'সীমানা বিরোধ' দেখে এসেছি। সংসদ সদস্যদের সাংবিধানিক দায়িত্ব আইন প্রণয়ন হলেও স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের 'ভূমিকা' অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের ক্ষুব্ধ করে থাকে। সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধির বিরোধের জের ধরে উন্নয়ন প্রকল্প বছরের পর বছর আটকে থাকছে- এমন নজিরও কম নেই। এমনকি আরও উচ্চতর স্তরে খোদ জাতীয় সংসদ ও সচিবালয়ের মধ্যেও বিরোধের রেশ আমরা সম্প্রতি দেখেছি।

আমাদের মনে আছে, গত জুন মাসে জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য 'দেশ পরিচালনায়' আমলাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিয়ে 'কঠোর সমালোচনা' করেছিলেন। ক্ষমতাসীন দলেরই একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদক্রম বা 'ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স' লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন তখন। গত মাসে বরিশাল সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধি ও আমলার বিরোধের জল অনেকদূর গড়িয়েছিল। বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি তো বটেই, পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিল।

উভয়পক্ষের মধ্যে 'সমঝোতা' হলেও, এখতিয়ারগত বিরোধের 'মীমাংসা' হয়েছে এমনটি দাবি করা যাবে না। আর উপজেলা প্রশাসনে চেয়ারম্যান-ইউএনও বিরোধ বলা চলে কয়েক দশক পুরোনো। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মধ্যে 'প্রশাসনের বাড়াবাড়ি' নিয়েও অভিযোগ উঠতে দেখা গেছে। বিশেষত গত বছর দেশের কোথাও কোথাও 'অনিয়ম ও দুর্নীতি' নিয়ে জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা মনে করি, আইন ও বিধানের যথাযথ প্রতিপালনেই রয়েছে সমাধান। আদালতের আদেশেও বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।

আইনে স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে পরিপত্র জারি করে বিভিন্ন কমিটিতে ইউএনওদের সভাপতি বা আহ্বায়ক এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের কেন ঢাল তলোয়ারবিহীন 'উপদেষ্টা' করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন সংগত। এসব ক্ষেত্রে 'উপজেলা পরিষদ' ব্যবহারের বদলে 'উপজেলা প্রশাসন' শব্দবন্ধ ব্যবহারের মতো 'আইনের প্যাঁচ' কেন ঘটেছিল, তাও খতিয়ে দেখা হোক বিলম্বে হলেও। উপজেলা চেয়ারম্যানদের পক্ষে রিটকারী আইনজীবীর সঙ্গে আমরা একমত যে, হাইকোর্টের আলোচ্য আদেশের মধ্য দিয়ে পরিপত্রগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা আইন ও বিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন।

বস্তুত জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি যদি নিজ নিজ এখতিয়ার মেনে চলেন, তাহলে কোনো গোলযোগই ঘটে না। এতে করে একদিকে যেমন দেশ পরিচালনা সুচারু হয়, তেমনই অহেতুক বিরোধের মীমাংসাও সহজ হয়। এটাও ভুলে যাওয়া চলবে না- এখতিয়ারই শেষ কথা নয়। এর সঙ্গে সামর্থ্য ও যোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ যখন আর্থসামাজিকভাবে এগিয়ে চলছে, তখন রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও সরকারি ব্যবস্থাপনাও ক্রমে বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে তাল মেলাতে হলে আগের মতো কেবল জনপ্রিয়তাই যথেষ্ট নয়, জনপ্রতিনিধিদের ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতাও জরুরি। আমাদের জনপ্রতিনিধিদের তাই দক্ষতা বৃদ্ধির কথা দীর্ঘমেয়াদে হলেও ভাবতে হবে।

মন্তব্য করুন