টেকসই বন ও জীবিকা সংক্রান্ত 'সুফল' প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সুফলের বদলে কুফলের যে চিত্র শনিবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা বেদনাদায়ক হলেও বিস্ময়কর নয়। বস্তুত অতীতেও বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের 'উন্নয়ন' প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমাদের নদী, বন, পাহাড় ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার 'অবনমন' ঘটতে দেখেছি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাড়তি যে বিষয়টি আমাদের উদ্বিগ্ন করছে, তা হচ্ছে বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো বৈদেশিক ঋণ। ২০১৮ সালে সূচিত পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে আনা হয়েছে বিশ্বব্যাংক থেকে। এখন প্রকল্প যদি ভেস্তে যায়, তাহলে একদিকে প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হবে, অন্যদিকে ঋণের বোঝা টানতে হবে বাংলাদেশকে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে যদিও বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে; এখন দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালে প্রকল্প শেষ হতে হতে বিদ্যমান প্রতিবেশ ব্যবস্থাই বরং নাজুক হয়ে পড়বে।

সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- প্রকল্প-সংশ্নিষ্ট মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা বনে গাছ লাগাতে গিয়ে অন্যান্য গাছ যেভাবে ধ্বংস করছেন, তাতে শেষ পর্যন্ত নাকের বদলে নরুন মিলতে পারে। আমরা আরও বিস্মিত এটা জেনে যে, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের 'স্পষ্ট ধারণা' নেই! তাহলে কি সম্ভাব্যতা যাচাই এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে? এ ছাড়া প্রকল্পের লক্ষ্য হিসেবে 'বনকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীর বননির্ভরতা কমিয়ে' কথিত আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটানোর বিষয়টিও আমাদের বোধগম্য নয়। বিশ্বব্যাপীই বন সংরক্ষণের একটি প্রমাণিত ও টেকসই পদ্ধতি হচ্ছে, বনজীবীদের সম্পৃক্ত করা। এ ক্ষেত্রে উল্টো গীত গাওয়া হচ্ছে কীসের ভিত্তিতে! মন্দের ভালো যে, প্রকল্পটি নিয়ে খোদ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদনে 'কিছু অসংগতি' তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গাছ লাগানোর শর্ত না মানা, সেগুলো যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করা।

আমাদের প্রশ্ন- যদি প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে অস্পষ্টতা থাকে, আর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অসংগতি থাকে; যদি বন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী বিপন্ন হয়, আর বনজীবীরা এতে উচ্ছেদ হওয়ার আতঙ্কে থাকে; তাহলে এ প্রকল্পের প্রয়োজন কী? আমরা দেখতে চাইব অবিলম্বে প্রকল্পটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এভাবে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে বন উন্নয়নের নামে বনবিনাশী তৎপরতা আর চলতে দেওয়া যায় না। বাংলা প্রবাদে আমরা ঋণ করে ঘি খাওয়ার কথা শুনে থাকি। আলোচ্য প্রকল্পে যেন ঋণ করে বিষ খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, নানা প্রকল্প ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এমনিতেই আমাদের বনাঞ্চলের পরিস্থিতি নাজুক। পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষায় অতি প্রয়োজনীয় বনাঞ্চলের অনুপাত কাগজে-কলমে 'সংরক্ষিত' থাকলেও ভেতরে ভেতরে কীভাবে ফোকলা হয়ে যাচ্ছে!

এর আগে সমকালেই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, দেশে গত দেড় যুগে উজাড় হয়ে গেছে পৌনে চার লাখ একরের বেশি বনভূমি, যা মোট বনভূমির প্রায় ৮ শতাংশ। শুধু অভ্যন্তরীণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল ক্রমেই ফোকলা হয়ে চলেছে, এমন নয়। আমরা দেখছি, উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনও নানাদিক থেকে স্বস্তিতে নেই। এর ভেতর দিয়ে যান্ত্রিক নৌযান চলাচল, বনদস্যুদের গাছ ও প্রাণী শিকার বিনষ্ট করে চলেছে এর স্বাভাবিক প্রতিবেশ। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মতো এসেছে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে প্রস্তাবিত নানা শিল্পকারখানা ও কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র।

এসব 'মানবসৃষ্ট' দিক ছাড়াও সুন্দরবনের আয়তন হ্রাসের মতো 'প্রাকৃতিক' আশঙ্কা রয়েছে। সুন্দরবন ছাড়াও উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনীও আমরা ক্রমে ফিকে হতে দেখেছি। এমন পরিস্থিতিতে এ আশা দুরাশা হতে পারে না- যতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, সেই বনাঞ্চল সুরক্ষায় অবিলম্বে মনোযোগী হবেন বন বিভাগের নীতিনির্ধারকরা। তার বদলে প্রকল্পের নামে জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট করে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর পকেট ভরানোর মচ্ছব চলতে দেওয়া যায় না জাতীয় স্বার্থেই।

মন্তব্য করুন