দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি শিল্প খাতে গ্যাসের সাম্প্রতিক সংকট উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছালেও সমাধানের গতি বিস্ময়কর শ্নথ। রোববার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে গ্যাসের জন্য শিল্পক্ষেত্রে 'হাহাকার' চলার যে কথা বলা হয়েছে, তা অত্যুক্তি হতে পারে না। গ্যাসের চাপ কম থাকায়, বিশেষ করে পোশাকশিল্প কারখানায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেশিন চলছে না। এতে সক্ষমতা অনুসারে উৎপাদন করতে না পারায় তারা আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন। করোনা মহামারি-পরবর্তী এ সময়ে যখন পূর্ণোদ্যমে শিল্পকারখানা চলছে; যখন করোনা মহামারির তীব্রতা কমার কারণে বিশ্ববাজার থেকে অধিক হারে রপ্তানি আদেশ আসছে, তখন গ্যাস সংকট শিল্পোদ্যোক্তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলছে। আমরা মনে করি, দেশের স্বার্থেই গ্যাসের সমাধান জরুরি। গ্যাস সংকটের কারণে উদ্যোক্তাদের রপ্তানি আদেশ বাতিলের শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তেমনটি ঘটলে কিংবা গ্যাসের দ্রুত সমাধান না হলে সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।

সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চলের শিল্পকারখানায় গ্যাসের জন্য হাহাকার চলছে। যেখানে বিশেষ করে পোশাক, টেক্সটাইল কারখানার সংকট জুনের পর থেকে যথেষ্ট উদ্বেগজনক। আমরা দেখেছি, সংকট নিরসনে সরকার যানবাহনে ব্যবহূত সিএনজি স্টেশন প্রতিদিন চার ঘণ্টা বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্তত নিয়েছে। তাতেও সরকার তীব্র গ্যাস সংকট সামাল দিতে পারবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আমরা জানি, জ্বালানি হলো শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি। স্বাভাবিকভাবেই গ্যাস না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়।

সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, গ্যাস সংকটের মূল কারণ জুন মাস থেকে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি কম হওয়া; একই সঙ্গে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া। জ্বালানি বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি এলএনজি কেনা বন্ধ রয়েছে। প্রশ্ন হলো, গ্যাসের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এলএনজি আমদানি বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা কী? এটা সমস্যার কোনো সমাধান হতে পারে না। বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বাড়লে বা কমলে দেশেও গ্যাসের দামে প্রয়োজনে তারতম্য ঘটবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত করা যাবে না। যেভাবেই হোক শিল্প খাতে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা মনে করি, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে বলে সামনে এলএনজির ওপর নিভর্রতা আরও বাড়বে। তাই এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করে খোলাবাজার এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মধ্যে সমন্বয় করে কেনাকাটা করতে হবে। পাশাপাশি দেশে গ্যাসের উৎপাদন যেহেতু কমছে, দীর্ঘমেয়াদে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কারের প্রচেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে। সমকালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত সাগরে তেল-গ্যাস আবিস্কারে এগিয়ে গেলেও অনেক সম্ভাবনাময় হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা তাগিদ দিয়ে বলেছি, জরুরি ভিত্তিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে, নতুবা অদূর ভবিষ্যতে দেশ গ্যাস সংকটে পড়তে পারে। আমদানি করেও সে সংকটের সমাধান সম্ভব হবে না। তবে শিল্পের এ দুরবস্থায় বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সমকালের প্রতিবেদককে বলেছেন, আবার খোলাবাজার থেকে গ্যাস কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং এ মাসের শেষদিকে নতুন কার্গো এলে সংকটের একটা সুরাহা হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, এলএনজি আনার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা হবে এবং গ্যাস সংকটের সমাধান হওয়া পর্যন্ত এলএনজি আমদানি অব্যাহত থাকবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কয়েক দশকের ব্যবধানে রপ্তানি আয় প্রায় শতগুণ বৃদ্ধি, প্রায় ৪০ লাখ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানসহ অনেক ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলা এ পোশাকশিল্প সচল রাখার স্বার্থেই গ্যাস সংকটের সমাধান জরুরি।

মন্তব্য করুন