নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়দায়িত্ব পালনে ফের নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতার যে নজির মিলল, তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। মঙ্গলবার সমকালসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে ১৬০টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ৯টি পৌরসভা নির্বাচনে মৃত্যু, সংঘর্ষ, গোলাগুলি আর ভোট বর্জনের চিত্র উঠে এসেছে। নিহত দু'জন ভোট গ্রহণ চলাকালে এবং একজন ভোটের আগের রাতে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে মারা যান। আহতের সংখ্যাও কম নয়। আমরা জানি, এখন স্থানীয় সরকার কাঠামোর ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভায় মেয়র পদে প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেন দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে। কোনো কোনো স্থানে বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও ভোটার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো- সমকালে প্রকাশিত এ খবর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য স্বস্তির হলেও জোর করে ব্যালটে সিল মারা, ব্যালট পেপার ছিনতাই, প্রার্থীর এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়ার খবরগুলো স্পষ্টতই অশুভ বার্তা দেয়। এ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। ভোটে অনিয়মের অভিযোগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত কয়েকজন প্রার্থীও ভোট বর্জন করেছেন। আমরা জানি, গত এপ্রিলে প্রথম ধাপে ৩৭১টি ইউপিতে ভোট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমণের কারণে তখন ভোট স্থগিত হয়ে যায়। পরে ২১ জুন ২০৪টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ করা হয়। তবে যেসব এলাকায় সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল না, সেসব এলাকায় তখন ভোট গ্রহণ করা হয়নি। প্রথম ধাপের স্থগিত থাকা ১৬০টিতে ভোট গ্রহণ করা হলো সোমবার। আমরা দেখেছি, প্রথম ধাপের ৩৭১টি ইউপির মধ্যে ৬৯টিতেই চেয়ারম্যান পদে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিপরীতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই লিখেছিলাম, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থার যেমন অলংকার, তেমনি নির্বাচন ব্যবস্থার মূল নিয়ামক শক্তি নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থার বিষয়টিও তাতে প্রতীয়মান। প্রার্থীদের আবেগের কারণে সহিংস ঘটনা ঘটেছে- ইসি সচিবের এমন মন্তব্য আমাদের বিস্মিত না করে পারেনি। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, বিগত দিনে স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন নির্বাচনে ইসি জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রেই দায়দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। নির্বাচন ব্যবস্থায় শুধু অনিয়মই নয়, ইসির কোনো কোনো কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধও হয়। আমরা জানি, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ যাবতীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের দায়দায়িত্ব ইসির। কিন্তু তাদের ওপর আস্থার সংকটের অভিযোগ নতুন নয়। প্রতিপক্ষহীন নির্বাচনেও নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন করতে না পারার কারণে তারা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে- এ বাস্তবতাও এড়ানো দুরূহ। আমরা মনে করি, সদ্য সমাপ্ত ইউপি নির্বাচনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সহিংসতা ও নির্বাচনী অনিয়মের ব্যাপকতা বেড়ে চলার পথ রুদ্ধ করতেই হবে। ভোটের ঐতিহ্যবাহী মেজাজ যাতে না হারায়, এর দায় নির্বাচন কমিশনেরই। নির্বাচনে উত্থাপিত অনিয়মের অভিযোগগুলোর যথাযথ প্রতিকার না হলে আগামীতে যে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান অস্বস্তিকর উপলক্ষ হিসেবে গণ্য হতে পারে। আমরা আশা করব, নির্বাচন কমিশন আরও কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত করতে সব রকম ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে সক্ষমতার পরিচয় দেবে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বহীনতা ও গাফিলতির কারণে নির্বাচনের চরিত্র নষ্ট হলে এর দায় তাদের ওপরই বর্তাবে। আমরা নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘর্ষ বা হতাহতের মতো মর্মন্তুদ পরিস্থিতির আর মুখোমুখি হতে চাই না। আমরা মনে করি, সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী নির্বাচন করা দুরূহ কোনো বিষয় নয়। তবে এ ক্ষেত্রে অংশীজনের দায়ও কম নয়। স্থানীয় সরকারের 'নিরুত্তাপ' নির্বাচনেও রক্তপাত ও প্রাণহানি কমিশনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোকেই শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার যে পারদ নেমে গেছে- এর পুনরুদ্ধারের দায় তাদেরই।

মন্তব্য করুন