দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সরকারের নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বশীল কারোর অনিয়ম-দুর্নীতি, অস্বচ্ছতার অভিযোগের পরও দেশে দারিদ্র্যের হার যে কমেছিল- এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু করোনা-দুর্যোগের অভিঘাতে দারিদ্র্যের হার ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে। সামাজিক ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দৃশ্যমান। সরকার করোনার প্রেক্ষাপটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বলয়ও সম্প্রসারিত করে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হতাশাব্যঞ্জক তথ্য। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরিদ্রের তালিকা চূড়ান্ত করতেই পার হয়ে গেছে পাঁচ বছর! করোনা মহামারির আগে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ শতাংশ। করোনাকালে সরকারি হিসাবেই তা বেড়ে হয়েছে ২৫ শতাংশ। এই নিরিখে দেশে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটি।

আমরা জানি, ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। 'শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ'- এই স্লোগান সামনে রেখে যে কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছিল পাঁচ বছর আগে, সেই কর্মসূচির লক্ষ্যদল চূড়ান্ত করা আজও সম্ভব হয়নি সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠার অভাবে। নির্ধারিত ৫০ লাখ দরিদ্রের তালিকায় এখন পর্যন্ত নাম উঠেছে ৪৯ লাখ ৫৩ হাজার ৩৮৫ পরিবারের। করোনার পূর্বাপর পরিস্থিতির আলোকে সরকারের এত বড় একটি কর্মসূচির লক্ষ্যদল চূড়ান্ত করতে দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতার যে নজির মিলল, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

আমরা জানি, এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউপি চেয়ারম্যানদের নেতৃত্বে কমিটি রয়েছে। তারাই হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা করে সুবিধাভোগীদের কার্ড দেন। এ ব্যাপারে সমকালের পক্ষ থেকে ৫০ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রায় অর্ধেকের কাছ থেকেই উত্তর মিলেছে- তালিকাভুক্ত হতে কতজন বাকি, তা তাদের জানা নেই! প্রযুক্তির যে বিকাশ ইতোমধ্যে দেশে ঘটেছে, এর মাধ্যমে এই তালিকা তৈরি করা কিংবা উপকারভোগীর যোজন-বিয়োজন মোটেও দুরূহ কোনো বিষয় ছিল না। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নীতিমালার ভিত্তিতে দরিদ্রদের তালিকা করার উদ্দেশ্যে 'ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ পভার্টি ডাটাবেস' নামে একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয় ২০১৩ সালে। পরে এ প্রকল্পের নতুন নামকরণ হয় 'ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডাটা'। এরই মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে চার গুণ, আর সময় অতিবাহিত হয়েছে আট বছর। তার পরও চূড়ান্ত করা যায়নি দরিদ্রদের তালিকা! এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বশীল সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তত্ত্বাবধানে এ ব্যাপারে যে অর্থ ব্যয় ও সময়ক্ষেপণ হয়েছে, তা মহাকাব্যিক।

আমরা মনে করি, যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রাথমিক শর্ত সংশ্নিষ্ট বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য, হালনাগাদ তালিকা ইত্যাদি। বস্তুত আমাদের বিবেচনায় এ ধরনের তথ্যব্যাংক আরও আগেই গড়ে তোলা উচিত ছিল। আমরা এও মনে করি, তা সময়মতো করা গেলে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি আরও সুনির্দিষ্ট, গতিশীল ও সফল হতো। শুধু তালিকার অভাবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি যে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে, তালিকা তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্তরা এর দায় এড়াতে পারেন না।

আমাদের স্মরণে আছে, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিলেন, ত্রুটিপূর্ণ তথ্যের কারণে সেই তালিকা থেকে ১৫ লাখ নাম বাদ দিতে হয়েছিল। গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য দায়িত্বশীল কারও কারোর উদাসীনতায় ম্লান হবে, তা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা দেখতে চাইব, দায়ীদের জবাবদিহির পাশাপাশি দরিদ্রদের তালিকা অবিলম্বে সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারের দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে করোনা-দুর্যোগেও আরও সাফল্য অর্জন অস্বাভাবিক ছিল না। 'নাতি-খাতি বেলা গেল শুতি পারলাম না'- জনপ্রিয় এই বাংলা গানটি যেন এ ক্ষেত্রে নিয়তি হয়ে না দাঁড়ায়।

মন্তব্য করুন