শুক্রবার সমকালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে 'বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশ সূচক-২০২১' প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ইতিবাচক বার্তা। ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ মসৃণ করতে একদিকে যেমন বিধিবিধানের প্রক্রিয়া সহজীকরণ জরুরি, তেমনি অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সরকারের উদার সহযোগিতারও বিকল্প নেই। আমরা জানি, আমাদের ব্যবসায়ীরা নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে অনেক সময়ই কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পান না। সহজে ঋণপ্রাপ্তি, কারখানার জন্য জমি, বিকাশমান প্রযুক্তির সহায়তা, তথ্যপ্রাপ্তির পথ অবারিত করা, কর পরিশোধ ব্যবস্থা সহজীকরণ, ক্রস বর্ডার ট্রেড ইত্যাদি ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করার অন্যতম সহায়ক বিষয়।

ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে দেশি কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে প্রথম এ ধরনের সূচক প্রকাশ করা হলেও এর আগে বিশ্বব্যাংক 'ইজ অব ডুয়িং বিজনেস' বা সহজে ব্যবসার সূচক ও দেশভিত্তিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছিল। এবার বাংলাদেশের দুটি প্রতিষ্ঠান সারাদেশের এক হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে ১০টি বিষয়ে মতামত চায়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান তাদের মতামত জানিয়েছে এবং এরই ভিত্তিতে তৈরি হয় এই প্রতিবেদন।

আমরা জানি, ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্বব্যাংকের 'ইজ অব ডুয়িং বিজনেস' প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আট ধাপ অগ্রগতির চিত্র উঠে এসেছিল। আমরা মনে করি, ব্যবসার জন্য উল্লেখযোগ্য বাধাগুলো সম্পর্কে সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো জ্ঞাত। এমতাবস্থায় তাদের দায়িত্ব বাধাগুলো দূর করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। ব্যবসা শুরু, নির্মাণ অনুমোদন, জ্বালানিপ্রাপ্তি, সম্পত্তি নিবন্ধন, বিনিয়োগকারীর স্বার্থরক্ষা- এসব ক্ষেত্রে যেসব প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান এর নিরসন করা জরুরি সামগ্রিক স্বার্থেই।

অভিযোগ আছে- সড়ক, প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর সুবিধা ব্যবসায়ীরা যথাযথভাবে পান না। শ্রম বিধিমালার উন্নয়ন ইতোমধ্যে হলেও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ও অন্য দেশের সঙ্গে ব্যবসার সূচকে উন্নয়নের ব্যাপারে যে দাবি ব্যবসায়ীদের রয়েছে, এসবই আমলে নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে জরুরি হলো দক্ষতা বৃদ্ধি। সহজে ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক অভিযোগ। বিনিয়োগের পথ মসৃণ করতে ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ ও গতিশীল করার বিকল্প নেই। নীতিনির্ধারকরা দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগের যে আহ্বান জানান, এর সুফল কোনোভাবেই মিলবে না যদি বিদ্যমান সমস্যার নিরসন করা না যায়। ব্যবসা সহজীকরণের ব্যাপারে সরকারের যে ইতিবাচক ভাবনা রয়েছে এর বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। উচ্চ সুদহার, অনিয়ম-দুর্নীতি, অনৈতিক লেনদেন, পরিবহন খরচসহ যেসব বিষয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আছে, সেসব নিরসনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্র এগোচ্ছে দ্রুতগতিতে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদেরও করণীয় কাজগুলো করতে হবে সময়ক্ষেপণ না করে। আমরা যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি এর বাস্তবায়নে আন্তরিক প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। পরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়নের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতি আমলে রেখে নিতে হবে সার্বিক প্রস্তুতি।

করোনা অতিমারির কারণে ব্যবসায়ীরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যদিও সরকারের তরফে কিছু প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে কিন্তু এ ক্ষেত্রে কিছু অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গতি সঞ্চার ও সার্বিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও এর বাস্তবায়ন জরুরি। আমরা বিশ্বাস করি, সংশ্নিষ্ট সব পক্ষের হাত একত্র হলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছা দুরূহ নয়।

মন্তব্য করুন