দেশের জ্বালানি খাতে 'অশনিসংকেত' দেখা দেওয়ার যে ভাষ্য শনিবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে, তাতে অত্যুক্তি নেই। আমরা জানি, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মূলত গ্যাসনির্ভর। একসময় দেশ 'গ্যাসের ওপর ভাসছে' দাবি করা হলেও এখন দেখা যাচ্ছে, ক্রমেই কমছে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন। কয়েক বছর আগেও যেখানে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ২৭০ কোটি ঘনফুট ছিল, এখন তা কমে ২৪০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। মজুদ ও উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ নিয়েও আশাব্যঞ্জক খবর নেই। খোদ পেট্রোবাংলা বলছে, দেশে গ্যাসের মজুদ রয়েছে ৩৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট তথা টিসিএফ। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য সাড়ে ২৮ টিসিএফের ভেতর ইতোমধ্যে উত্তোলিত হয়েছে ১৫ টিসিএফ গ্যাস। স্বাভাবিকভাবেই আগামী কয়েক বছরের মধ্যে উত্তোলনযোগ্য অবশিষ্ট গ্যাস ফুরিয়ে যাবে। তখন পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেব? ওদিকে এলপিজির কাঁচামালের ৯৮ শতাংশই আমদানি করা হয়।

আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, একদিকে যেমন দেশে এনএলজিনির্ভরতা বাড়ছে, তেমনই বিশ্ববাজারে 'হুহু করে' বাড়ছে এর দাম। এটাও ভুলে যাওয়া চলবে না যে, দেশে যদিও কয়লার মজুদ রয়েছে, তার মজুদ ও উত্তোলনযোগ্যতা সন্তোষজনক নয়। পাঁচটি কয়লাক্ষেত্রের মধ্যে শুধু বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে। দেশীয় খনির কয়লা সরবরাহ কমে আসায় গত বছরই আমদানি করা কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। আর জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আমরা সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর। গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরতা যত কমবে, জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা তত বাড়তে থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র বিশেষত সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ও উত্তোলনের বিকল্প নেই। সে ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে হতাশার মহাকাব্যিক চিত্র।

আমরা দেখছি, সাত বছর আগেই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তি হলেও এখনও জরিপ ও অনুসন্ধান কাজ বহুলাংশে আটকে আছে দরপত্র আহ্বানে। বস্তুত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছিলাম, সমুদ্রভিত্তিক 'ব্লু ইকোনমি' তথা সুনীল অর্থনীতির 'বিপুল সম্ভাবনা' নিয়ে কথাবার্তা অনেক হলেও, কাজে ততটা আগানো সম্ভব হয়নি। সুনীল অর্থনীতির সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে যে গবেষণা বিলম্বে হলেও শুরু হয়েছে, তাও সীমিত রয়েছে চট্টগ্রাম থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত উপকূলীয় পর্যায়ে। এমনকি সমুদ্র গবেষণা উপযোগী জাহাজ থাকার মতো নূ্যনতম সক্ষমতার অভাবে বিস্তৃত মহীসোপান থেকে একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত গবেষণা শুরু করা যাচ্ছে না। অথচ ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পরপরই এসব বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত ছিল। ওদিকে ভারত ও মিয়ানমার তাদের সীমানায় গ্যাস অনুসন্ধান, আবিস্কার, এমনকি উত্তোলনও চালিয়ে যাচ্ছে।

আমরা মনে করি, বিলম্বে হলেও জ্বালানি সংকট কাটাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ এখনই নিতে হবে। খোদ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী যদিও জ্বালানি খাতে অতীতে কর্মরত কর্মকর্তাদের অদক্ষতার দিকে আঙুল তুলেছেন; তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা একটি সরকার এ পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারে না। আমরা স্বীকার করি, গত তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি এনেছে। কিছু সমালোচনা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল সাফল্য এসেছে- অস্বীকার করা যাবে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম যথার্থই বলেছেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর ভরসা করতে চান না; আমরা তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। আমরা মনে করি, প্রথাগত জ্বালানির সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সর্বোচ্চ সম্ভাবনাও বাস্তবায়ন করতে হবে বাংলাদেশকে। আমরা দেখছি, উন্নত বিশ্ব তো বটেই, প্রতিবেশী ভারতও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি মনোযোগ বাড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের জ্বালানি নীতিনির্ধারকরা অনেকবারই বলেছেন, বাংলাদেশও একক কোনো জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। কিন্তু সবকিছুর মূলকথা হচ্ছে, বসে থাকা চলবে না। সময়ে যদি আমরা এক ফোঁড় দিতে না পারি, তাহলে অসময়ে দশ ফোঁড় দিয়েও লাভ হবে না।

মন্তব্য করুন