ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে জাতিসংঘের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের যেমন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলেছে, তেমনি রোহিঙ্গারাও দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে।

রোববার সমকালসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, শনিবার সচিবালয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সমঝোতা স্মারক সই হয়। এ সমঝোতার ফলে সরকার ও ইউএনএইচসিআর যৌথভাবে ভাসানচরে রোহিঙ্গা নাগরিকদের খাদ্য ও পুষ্টি, সুপেয় পানি, পয়ঃনিস্কাশন, চিকিৎসা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, মিয়ানমারের ভাষায় পাঠক্রম ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং জীবিকায়নের ব্যবস্থা করবে। আমরা জানি, সরকার রোহিঙ্গা স্থানান্তরে নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। সেখানে জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সেখানকার ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রক্ষা করতে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ এবং এক লাখ রোহিঙ্গা বসবাসের উপযোগী ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করা হয়। মনোরম পরিবেশে সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, যেখানে প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারের জন্য পাকা ঘরের পাশাপাশি গড়ে তোলা হয় মাছ চাষ, কৃষিকাজ ও পশুপালন ব্যবস্থা।

সেই সঙ্গে সূচিশিল্পনির্ভর জীবিকার ব্যবস্থাও করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকা এবং ভাসানচর প্রকল্প সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাবে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রথম দিকে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘসহ বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা ভাসানচর পরিদর্শনের পর ধারণা বদলাতে শুরু করে। এর পরই ভাসানচরে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত হতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর উদ্যোগী হয়। এ সময় জাতিসংঘের এ পদক্ষেপে আমরা সংস্থাটিকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। এ মুহূর্তে এটি জরুরি ছিল। কারণ বাংলাদেশের একার পক্ষে ভাসানচরে এই ব্যয়ের বোঝা বহন করা কঠিন। যদিও বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়াসহ তার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে শুরু থেকেই মানবতার পক্ষে কাজ করছে।

এখন ভাসানচরে জাতিসংঘের যুক্ত হওয়ার ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য সেখানে আরও স্বস্তিদায়ক অবস্থা তৈরি ও জীবিকার আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এমনকি এর ফলে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যাওয়া, সমুদ্রপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টার মতো বিপজ্জনক প্রবণতাও কমবে। সংবাদমাধ্যমের হিসাবমতে, ভাসানচরে ইতোমধ্যে ১৮ সহস্রাধিক রোহিঙ্গা রয়েছে। আমরা মনে করি, জাতিসংঘের এ উদ্যোগের ফলে সেখানে অন্যান্য রোহিঙ্গাও নির্দি্বধায় আসতে চাইবে। এ চুক্তির মাধ্যমে এক লাখ রোহিঙ্গার মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে বলে আরও ৮০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আগামী এপ্রিলের মধ্যে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এর ফলে কক্সবাজারের ওপর যেমন চাপ কমবে, তেমনি সেখানকার পরিবেশের জন্যও উপকারী হবে।

তবে মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গাদের নিজের দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই এ সংকটের মূল সমাধান। ভাসানচর কিংবা কক্সবাজারে মিয়ানমারের নাগরিকদের থাকার যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা সাময়িক। সুতরাং মিয়ানমারের এসব বাস্তুচ্যুত নাগরিককে দ্রুত ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা জরুরি। এ জন্য জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ অন্যান্য দেশের সার্বিক সহায়তা প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও সম্মানজক প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে মানবতার জয় হবে এবং রোহিঙ্গাদের যে চাপ আমরা বহন করছি তা থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হবে।

আমরা মনে করি, জাতিসংঘের এ সমঝোতা সেদিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হলে মিয়ানমারের ওপর এক ধরনের বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। ইতোপূর্বে উল্লেখযোগ্য দেশ মিয়ানমারের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের প্রত্যাশিত ভূমিকা আমরা দেখিনি বললেই চলে। বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা এবং কয়েকটি দেশের সমর্থনের কারণে মিয়ানমার পার পেয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রত্যাশা করি, ভাসানচরের ব্যাপারে জাতিসংঘের যে সহানুভূতি জাগ্রত হয়েছে, একইভাবে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানেও জাতিসংঘ উদ্যোগ নিতে যথাযথ ভূমিকা পালন করবে। 

মন্তব্য করুন