দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার পরও ভয়ংকর এই অপরাধ না কমার বিষয়টি উদ্বেগজনক। গত বছর এ শাস্তি নির্ধারণের পর স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব প্রত্যাশিত ছিল। যদিও এটা স্পষ্ট, কেবল আইন দিয়ে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ কমানো যাবে না। তারপরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনের যথাযথ প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারের উপায় নেই। আমরা দেখেছি, একের পর এক ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলে গত বছরের অক্টোবরে মন্ত্রিসভায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। আগের আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড থাকলেও আইন সংশোধন করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয় মৃত্যুদণ্ড। বুধবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন অনুসারে, এক বছরে ধর্ষণ কমেনি বরং বেড়েই চলেছে। গত এক বছরে ধর্ষণ মামলার রায়ে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়নি।

এ সময়ে অবশ্য মৃত্যুদণ্ড না হওয়ার পেছনে যুক্তি রয়েছে, আগের আইনে অভিযোগ গঠন হয়েছে বলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তারপরও এটা সত্য, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধে আমাদের কঠোর আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটলেও এসব অপরাধীর শাস্তির উদাহরণ অনেক কম। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর ধর্ষণের ঘটনায় করা মামলাগুলোর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় সাত ভাগেরও কম মামলা। আর সাজা পায় স্বল্প সংখ্যক আসামি। আইনের ত্রুটি, ফরেনসিক টেস্টের সীমাবদ্ধতা, প্রভাবশালীদের চাপ, অর্থের দাপট এবং সামাজিক কারণে এ রকম হচ্ছে বলে ধর্ষণের শিকার নারী ও তার পরিবারকে আইনি সহায়তা দেওয়া মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্যের সঙ্গে আমরা বহুলাংশে একমত।

আমরা জানি, নারীর প্রতি নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা ধর্ষণের মতো ঘটনা অধিকাংশই আদালত পর্যন্ত গড়ায় না। যেগুলোর মামলা হয় সেখানেও যদি অপরাধীর পার পাওয়ার সুযোগ থাকে, তা অগ্রহণযোগ্য। আমরা মনে করি, ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা নিরসনের জন্য প্রথমেই অপরাধীর শাস্তি দ্রুততর করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা দেখেছি আলোচিত ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের মামলার রায় কম সময়ে হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য মামলার সেই দীর্ঘসূত্রতা রয়েই গেছে।

বুধবার সমকালে প্রকাশিত ধর্ষণের মামলার বিচার সংক্রান্ত আরেকটি প্রতিবেদনে এসেছে, ধর্ষণের মতো শাস্তিযোগ্য জনগুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো বছরের পর বছর আদালতে বিচারাধীন থাকছে। অথচ আইনেই ধর্ষণের ঘটনায় করা মামলাগুলোর বিচারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ১৮০ দিন। ২০১৯ সালের ১৮ জুলাই সাত দফা নির্দেশনাসহ হাইকোর্টের এক রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের মুলতবি ছাড়াই ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। আমরা বিস্মিত, হাইকোর্টের এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে গত বছরের ডিসেম্বরে বিচারকদের উদ্দেশে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও ধর্ষণ মামলার বিচারে হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো এখনও উপেক্ষিত।

আমরা চাই, বিচার দ্রুতগতিতে শেষ করার লক্ষ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিচার করতে প্রত্যেক জেলায় আলাদা বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করা হোক। শাস্তি কঠোর করা এবং তার বাস্তবায়ন যেমন জরুরি, ধর্ষণের ঘটনা রোধে মনমানসিকতার পরিবর্তনও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অপরাধপ্রবণ মানসিকতার পরিবর্তনে সমাজ ও রাষ্ট্রের আরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন। আমরা প্রত্যাশা করি, ঘরে-বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই নারীর যথাযথ নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে ধর্ষণের মামলার বিচার সম্পন্ন হলে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরে উদ্যোগ গ্রহণ করলে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখব বলে আমরা বিশ্বাস করি। সরকারের পাশাপাশি ধর্ষণসহ সব ধরনের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। নারীর নিরাপত্তার স্বার্থেই সমাজের সর্বস্তরের জাগরণ প্রত্যাশিত।

মন্তব্য করুন