প্রতিবছর সার্বজনীন দুর্গোৎসব সামনে রেখে আমরাও প্রত্যাশা করি- মঙ্গলালোকে ভরে যাবে মর্ত্যধাম। কিন্তু জটিল সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় সবসময় সে প্রত্যাশা পূরণ হয় না- এবার দুর্গাপূজা চলাকালে কুমিল্লায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এবং তার জের ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপে ভাঙচুর, পুলিশ-হামলাকারী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে তা আরেকবার প্রমাণ হয়েছে। তবুও শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিনে সমকাল পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা সবাইকে, বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাই। শরৎকালের সাদা মেঘ, সাদা কাশফুল ও স্বচ্ছতোয়া নদী নিয়ে মর্ত্যে আগমন করেছিলেন দেবী দুর্গা।

তিনি আজ ফিরে যাচ্ছেন। একেক বছর দুর্গা দেবী একেক বাহনে আগমন ও গমন করেন। শাস্ত্রমতে, এবার দেবী এসেছেন ঘোড়ায় চড়ে, আর ফিরে যাচ্ছেন দোলায় চেপে। শাস্ত্রমতে, ঘোড়ায় আগমন অস্থিরতা ও অঘটনের লক্ষণ। দোলায় চেপে যাওয়া মড়কের অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু সেই অস্থিরতা যে দুর্গাপূজা চলাকালেই আভাস দেবে, আমরা এতটা আশঙ্কা করিনি। মন্দের ভালো যে, সব এলাকাতেই প্রশাসন দ্রুততার সঙ্গে সক্রিয় হয়েছে। সারাদেশে পুলিশ, র‌্যাবকে সতর্কাবস্থায় রাখা ছাড়াও এরই মধ্যে দেশের ২২ জেলায় মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার বলেছেন, এসব ঘটনার পেছনে যারাই জড়িত থাকুক, ছাড় দেওয়া হবে না। আমরাও দেখতে চাইব, দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, সামাজিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের মতোই আনন্দে, উৎসবে রঙিন হবে বাংলাদেশের আগামী দিনগুলো। আমরা জানি, বিজয়ার দিনের সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে বিদায়লগ্নের বেদনাও মিশে থাকে ভক্ত-হৃদয়ে। ফিরতি পথে তাদের বুকের মধ্যে বাজতে থাকে ঢক্কা নিনাদ। এ বিষয়টি কেবল ধর্মীয় নয়; সামাজিক ও সাংস্কৃতিকও।

দুর্গাপূজার সঙ্গে মিল রয়েছে বাঙালি পরিবারের কন্যার পিতৃগৃহে আগমন ও প্রস্থানের অনুভূতির প্রকাশ। আনন্দ ও বেদনার মিশ্রণ। আমরা দেখতে চাইব, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দুর্গাপূজার আনন্দ ও বিষণ্ণতা আমাদের সামাজিক জীবনকে ইতিবাচকভাবে স্পর্শ করবে। বস্তুত বাঙালি হিন্দুর সর্ববৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসবে এ দেশের অন্যান্য ধর্মের মানুষও উৎসবের আমেজে অবগাহন করতে ভালোবাসে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি বিরাট উপলক্ষও হয়ে ওঠে শারদীয় দুর্গোৎসব। তবে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এই সদ্ভাব ও সম্প্রীতির নিরন্তর মেলবন্ধনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যে কোথাও কোথাও অসুর শক্তি কাঁটা বিছিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। আমরা দেখতে চাইব, সবাই মিলে অন্ধকারের সেই শক্তিগুলোকে পরাস্ত করা হয়েছে। আবহমান কাল ধরে এটাই বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। নদীতে যেমন নানা ধারার স্রোত এসে অভিন্ন প্রবাহ হয়ে ওঠে, তেমনই হাজার নদীবিধৌত এই ব-দ্বীপে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অভিন্ন বাঙালি জাতি গঠন করেছে। এখানে মুসলিম ও হিন্দু ধর্মীয় উৎসব ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক মিলনের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। এখানে ঈদ বা পূজা সব মানুষের মধ্যে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

সমাজে সক্রিয় যে সাম্প্রদায়িক, উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী অশুভ চিন্তা ছড়িয়ে দিয়ে এ দেশের শান্তি ও সম্প্রীতির আবহ নষ্ট করে দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐতিহাসিকভাবে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও থাকতে হবে সমান সতর্ক। আমরা জানি, শাস্ত্রমতে দেবী দুর্গার পূজা মানেই অশুভ শক্তির প্রতীক অসুরের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়। সে জন্য চিরসুন্দর কল্যাণময়ী মাতৃরূপের সঙ্গে অসহায় ও নিপীড়িতের আশ্রয়ও তিনি। আর এখানেই শারদীয় দুর্গোৎসব সার্বজনীনরূপে আবির্ভূত। বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গেই শুধু নয়; সারাবিশ্বের যেখানেই বাঙালি হিন্দু রয়েছে, সেখানেই দেবী দুর্গা সমহিমায় পূজিত হন। এবারে দুর্গার আগমনকেও আমরা বাংলাদেশের জন্য, বাঙালির জন্য, মর্ত্যবাসীর জন্য শুভ সংবাদ হিসেবে বিবেচনা করতে চাই। দেবীর আগমনে শান্তি ও সদ্ভাব সর্বত্র প্রসারিত হয়ে আমাদের চারদিক মঙ্গলালোকে ভরে উঠুক। শুভ বিজয়া!

মন্তব্য করুন