বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা চলাকালে কুমিল্লায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জের ধরে দেবী বিসর্জনের পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে যে হামলা, সংঘর্ষ ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটে চলছে, তাতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দুর্গোৎসবে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা ঘটলেও অতীতে কখনও এভাবে 'সহিংসতার শিকল' দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়নি। আমরা মনে করি, আর একটি অঘটনও ঘটতে দেওয়া উচিত হবে না। বস্তুত গত কয়েক দিনে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সব পক্ষ সতর্ক থাকলে সেগুলোও সময় থাকতে প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। স্বীকার করতে হবে, কুমিল্লার ঘটনার পর প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় হয়েছে। আমরা দেখেছি, অন্তত ৩৫ জেলায় মোতায়েন করা হয়েছে আধা-সামরিক বাহিনী বিজিবি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের শীর্ষ মহল থেকেও সহিংসতার জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনার কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। তারপরও কেন নোয়াখালীসহ বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপ, মন্দির, বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটল- গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।

আমরা বিশ্বাস করি, হামলাকারীদের উপযুক্ত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অঘটন ঘটানোর অতি উৎসাহ বহুলাংশে কমে যাবে। দুর্ভাগ্যবশত, কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত এ ধরনের ঘটনার হোতারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমরা গভীর হতাশার সঙ্গে দেখেছি- এর আগে কক্সবাজারের রামু, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, দিনাজপুর সদর, রংপুরের গঙ্গাচড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, ভোলার বোরহানউদ্দিন, সুনামগঞ্জের শাল্লায় প্রায় একই কায়দায় 'ধর্ম অবমাননা' হওয়ার অভিযোগ তুলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। প্রায় সবক্ষেত্রে দেখা গেছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ছিল ষড়যন্ত্রমূলক। প্রায় সব ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুযোগ নিয়ে ধর্মপ্রাণ সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীকে উস্কানি দেওয়া হয়েছে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা আরেকবার সবার প্রতি আহ্বান জানাই যে, গুজবে কান দিয়ে ষড়যন্ত্রের শিকার হবেন না।

ষড়যন্ত্রকারীরা দেশ, সমাজ, এমনকি ধর্মেরও শত্রু। সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজনা ও গুজব ছড়ানো মানে তাদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া। মুসলিম বা হিন্দু- ধর্মীয় অনুভূতির মূল্য নিশ্চয়ই রয়েছে। আমরা সব নাগরিকের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু কোনো ধর্ম অবমাননা হলে বা কারও অনুভূতি আহত হলে আইনি উপায়েই তার প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। অতীতে কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, যার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ উঠেছিল, তিনি নিজেই আইনের আওতায় নিজেকে সোপর্দ করেছেন। পুলিশি তদন্তেও প্রমাণ হয়েছে যে, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ব্যক্তি বা মহলবিশেষের ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছু নয়।

আমরা আশঙ্কা করি, কুমিল্লাতেও একই ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। বাঙালি হিন্দু সমাজ তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ভণ্ডুল করার জন্য এ ধরনের কাজ যে করবে না, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা মনে করি, অপ্রমাণিত অভিযোগে একটি সম্প্রদায়ের ওপর নির্বিচার হামলা ফৌজদারি অপরাধ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। এর নেপথ্যে কোনো মহলের রাজনৈতিক কিংবা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থের বিষয় রয়েছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। সহিংসতার উদ্দেশ্য ও বিধেয় যা-ই হোক না কেন- এই নৈরাজ্য আর চলতে দেওয়া যায় না। যে কোনো মূল্যে আইনের শাসন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে হবে। তারও আগে যে কোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শান্তি ও শৃঙ্খলায় কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না।

বিশেষত যারা হামলা, সংঘাত ও গুজব সৃষ্টির জন্য দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। গত কয়েক দিনের সহিংসতায় নিহতদের স্বজন এবং আহতদের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই। কিন্তু মনে রাখতে হবে- বিষয়টি নিছক সহানুভূতির প্রশ্ন নয়। বারংবার একই ধরনের অঘটনের নেপথ্য শক্তিকে চিহ্নিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্য দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মোপলব্ধি জরুরি। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব আরও বেশি। জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদেরও দায়িত্বশীল হতে বলব আমরা। সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও সহিংসতা কারও জন্যই কল্যাণকর হতে পারে না।

মন্তব্য করুন